বিশ্বকাপ
‘ট্রাইওন্ডা’য় কোন সমস্যা হচ্ছে না গোলকিপারদের

সংগৃহীত ছবি
মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে মাঠে গড়িয়েছে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ। ম্যাচজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চোখ আটকে ছিল টিভির পর্দায়। তাদের সঙ্গে আমেরিকা, কোরিয়া ও জাপানের একদল বিজ্ঞানীও গভীর আগ্রহ ও উত্তেজনা নিয়ে দেখছিলেন ম্যাচটা।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মূল আকর্ষণ ছিল ম্যাচের ফল। খেলোয়াড়দের কাছে মূল বিষয় ছিল তাদের প্রতিপক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের পুরো মনোযোগ ছিল কেবল বলটির দিকে। কারণ উদ্বোধনী ম্যাচটিই ছিল 'ট্রাইওন্ডা' দিয়ে খেলা প্রথম ম্যাচ,যে বলটি নিয়ে তারা মাসের পর মাস গবেষণা করেছেন।
গবেষণার এই ফলটা স্বস্তি আর সন্তুষ্টিই এনে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের। কারণ এবারের অ্যাডিডাসের অফিসিয়াল বলটা অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করেনি। গোলরক্ষকদের কোনো অভিযোগও নেই। বরং স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে সাত সাতটি সেভ করে কেপ ভার্দের বীরে পরিণত হয়েছেন ৪০ বছরের গোলকিপার ভোজিনহা। অন্য দলের কোনো গোলকিপারও এ পর্যন্ত অভিযোগ করেননি ট্রাইওন্ডা নিয়ে।
প্রত্যেক দলের একটি করে ম্যাচ শেষে বিশ্বকাপে গোল হয়েছে ৭৫টি। অর্থাৎ ২৪ ম্যাচে গোলের হার ৩.১। প্রথম রাউন্ড শেষে এর চেয়েও বেশি গোলের হার ছিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপে (৩.৬)। ২০১৪ বিশ্বকাপেও প্রথম রাউন্ড শেষে গোলের হার ছিল ৩.০৬। এই পরিসংখ্যানই বলছে ট্রাইওন্ডা বলে প্রথম রাউন্ডে ৭৫ গোল অস্বাভাবিক কিছু নয়।
অভিযোগ চলছিল ২০১০ বিশ্বকাপ থেকেই
এ নিয়ে টানা ১৫ বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের বল সরবরাহ করেছে বিশ্ববিখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। নানা সময়ে তাদের বল যেমন প্রশংসিত হয়েছে তেমনি বিতর্কও ছড়িয়েছে। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ব্যবহৃত 'জাবুলানি' বলটি তার অদ্ভুত আচরণের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছিল। কারণ জাবুলানি বলটি একটু বেশিই মসৃণ ছিল। আর এই মসৃণতার কারণেই বলটি বাতাসে অদ্ভুতভাবে উড়ত। সাধারণত স্পিন ছাড়া (ঘুর্ণনহীন) কিক করলে বল একটি নির্দিষ্ট ও চেনা গতিপথে এগিয়ে যায়। কিন্তু জাবুলানির ক্ষেত্রে দেখা যেত, এটি মাঝ-আকাশে হঠাৎ থমকে যেত কিংবা দিক পরিবর্তন করত। বলের এমন খামখেয়ালি আচরণ পুরো ম্যাচের, এমনকি টুর্নামেন্টের ভাগ্যও বদলে দিতে পারত।
ব্রাজুকা-টেলস্টারেও সমস্যা কাটেনি
২০১৪ বিশ্বকাপে অফিসিয়াল বল 'ব্রাজুকা'য় গোলকিপারদের সমস্যা ছিল এর অস্বাভাবিক ও অনিশ্চিত মুভমেন্ট। বলটি খুব মসৃণ এবং তাপীয়ভাবে জোড়া লাগানো হওয়ায় এর বায়ুপ্রবাহ বা ড্র্যাগ কমে গিয়েছিল। তাই বাতাসে বল হঠাৎ দিক পরিবর্তন করত এবং গোলকিপারদের জন্য বলের গতিপথ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ত।
২০১৮ বিশ্বকাপে 'টেলস্টার ১৮' বলেও ছিল অস্বাভাবিক আচরণ। বলের চামড়ার নতুন ডিজাইন ও তাপীয় গঠন একে বাতাসের মাঝে হালকা করে দিয়েছিল, এজন্য বলটি বাতাসে অপ্রত্যাশিত বাঁক নিতো। দূর থেকে নেওয়া শটগুলো বলের গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন করতো।
সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে অ্যাডিডাসের ‘আল রিহলা’ বল নিয়েও অভিযোগের অন্ত ছিল না গোলকিপারদের। অতি-দ্রুতগতি এবং বাতাসে অবিশ্বাস্য মুভমেন্ট হত অ্যারোডাইনামিক ডিজাইন ও প্রযুক্তিগত কাঠামোর কারণে। এজন্য দূর থেকে নেওয়া শটগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে দিক পরিবর্তন করত।
‘ট্রাইওন্ডা’য় ফিরেছে স্বস্তি
এবারের বিশ্বকাপ বল ট্রাইওন্ডার প্যানেল সংখ্যা আগের চেয়ে কম। এর উপরিভাগ বেশ খসখসে। বলের ভেতরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সেন্সর বসানো আছে, যা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাঠায়।
এতসব আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করার পরও ট্রাইওন্ডার পারফরম্যান্সে কিন্তু খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। আর এটাই ছিল বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের 'ইউনিভার্সিটি অব পুগেট সাউন্ড'-এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভিজিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং এই গবেষণা দলের অন্যতম বিজ্ঞানী জন এরিক গফ এ নিয়ে বলেছেন,‘আপনি নতুন বল নিয়ে মার্কেটিং চান, প্রচার-প্রচারণা চান, উত্তেজনাও চান। কিন্তু বলটির নকশা এমনভাবে করা উচিত যেন মাঠে খেলোয়াড়দের কাছে এটা আলাদা কোনো বল বলে মনে না হয়।’
বলের গতি
গবেষণায় দেখা গেছে ট্রাইওন্ডা ঘণ্টায় প্রায় ২৭ মাইল (ঘণ্টায় ৪৩ কিলোমিটার) বেগে তার 'ড্র্যাগ ক্রাইসিস' ( বাতাসের বাধা হঠাৎ কমে যাওয়ার অবস্থা) স্তরে পৌঁছে যায়। এই গতি আল রিহলা, টেলস্টার ১৮ ও ব্রাজুকার গতিসীমার (যা ছিল প্রায় ৩১ থেকে ৪০ মাইল/ঘণ্টা) চেয়ে কম। আর জাবুলানির চেয়ে (৪৯ থেকে ৬০ মাইল/ঘণ্টা) অনেক নিচে।
এটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ একটি বল পায়ে লাগার মুহূর্তে সাধারণ মনে হলেও, বাতাসে ওড়ার সময় তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। এটাই ছিল জাবুলানি বলের মূল সমস্যা। সামান্য স্পিন দিয়ে শট নেওয়ার পর, বলটি যখন তার এই নির্দিষ্ট গতিসীমা পার হতো, তখন সেটির গতি হঠাৎ বড্ড বেশি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেত।
তবে ট্রাইওন্ডায় সেটা হচ্ছে না। কর্নার কিক এবং ফ্রি-কিকের স্বাভাবিক গতিসীমার মধ্যে এই বলটির ড্র্যাগ কোঅফিশিয়েন্ট (বাতাসের বাধা ) অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এটা যখন উচ্চ-গতিসম্পন্ন ও টার্বুলেন্ট-ফ্লো (এলোমেলো বাতাস) অবস্থায় প্রবেশ করে, তখন এর ড্র্যাগ কোঅফিশিয়েন্ট ব্রাজুকা, টেলস্টার ১৮ এবং আল রিহলার চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে। এর অর্থ হলো, জোরে আঘাত করা কোনো লং বল বাতাসে তার কিছুটা দূরত্ব বা পাল্লা হারাতে পারে। এই পার্থক্যের পরিমাণ অবশ্য খুব বেশি নয়।
প্যানেল কমলেও মান বেড়েছে
ট্রাইওন্ডা বলটিতে প্যানেল মাত্র চারটি। যুক্তি অনুযায়ী এটি জাবুলানির চেয়েও বেশি দিকবদল করার কথা? কিন্তু সেটা হয়নি। কারণ লেজার স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীদের দল মেপে দেখেছেন , ট্রাইওন্ডার প্যানেল জোড়া লাগানোর সেলাইগুলো জাবুলানির চেয়ে অনেক বেশি লম্বা, গভীর এবং চওড়া। এই গভীর সেলাই এবং বলের গায়ে খোদাই করা খসখসে খাঁজগুলোর (মাইক্রোটেক্সচার) কারণে বলের চারপাশের বাতাস সমানভাবে প্রবাহিত হয়। তাই বলটি বাতাসে অবিকল তার চেনা ও সঠিক পথেই এগিয়ে যায়।
এই খসখসে ভাব ও গভীর সেলাইয়ের জন্য বাতাসে ঘর্ষণ (ড্র্যাগ) কিছুটা বেড়ে যায়। উইন্ড টানেলে বলটি পরীক্ষা করার পর গফ এবং তার দল এর একটি বিশেষ প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন।
গফ জানিয়েছেন,‘বলের এই খসখসে উপরিভাগের জন্য কর্নার কিক বা ফ্রি-কিকের মতো তীব্র গতির শটের ক্ষেত্রে বাতাস বলটিকে একটু বেশি বাধা দেবে। তাই কর্নার বা ফ্রি-কিক গুলো আগের বিশ্বকাপের বলের তুলনায় কিছুটা কম দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।"
অ্যাডিডাসের মহাব্যবস্থাপক স্যাম হ্যান্ডি অবশ্য এটাকে বড় সমস্যা মনে না করে বলেছেন, ‘খোদাই করা নকশা, স্তরযুক্ত গ্রাফিকস আর উজ্জ্বল রং এই বলকে অন্যগুলোর থেকে আলাদা করেছে। এখন পর্যন্ত এটাই আমাদের তৈরি করা সবচেয়ে সুন্দর বল।’
বারবার কেন বল বদল?
প্রশ্ন আসতে পারে, বল প্রস্তুতকারকরা যদি বলের আচরণ একই রকম রাখার জন্য এতই মরিয়া হন, তাহলে প্রতি চার বছর পর পর বলের নকশা পরিবর্তন করার দরকার কী? আগের বলটাই কেন ব্যবহার করা হয় না?
এ নিয়ে অ্যাডিডাস কিছু না জানালেও প্রফেসর গফ জানালেন,‘এটি আসলে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলীদের মনের এক ধরণের কৌতূহল,আচ্ছা, আমরা কি এটা করতে পারব? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে এটাই কিন্তু মূল প্রেরণা। ঠিক ১৯৬০-এর দশকের মতো,মানুষ কেন চাঁদে যেতে চেয়েছিল? কারণ চাঁদ ওখানে ছিল, তাই! প্যানেলের সংখ্যা কেন কমিয়ে আনা হচ্ছে? কারণ আমরা এর আগে কখনো তা করিনি, এবং এটা একটা চ্যালেঞ্জ।’
বলের ভেতরে সেন্সর চিপ
এই বলের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সংযোজন ভেতরে থাকা ৫০০ হার্টজ গতির সংবেদনশীল সেন্সর চিপ। এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এজন্য বলে কোথায় স্পর্শ করা হয়েছে, বল কত গতিতে চলছে, কী পরিমাণ ঘূর্ণন তৈরি হচ্ছে এবং কোন দিকে যাচ্ছে-এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হবে। ১৪ গ্রাম ওজনের সেন্সরটি বলের ওজন, ভারসাম্য, বাউন্সে প্রভাব ফেলবে না বলে দাবি করেছে ফিফা। সেন্সরটি সচল রাখতে প্রতিটি ম্যাচের আগে বল চার্জ দিতে হয়।
ট্রাইওন্ডার বিশেষত্ব
ট্রাইওন্ডা নামটি এসেছে দুটি শব্দ ট্রাই ও ওন্ডা থেকে। ট্রাই মানে তিন আর ওন্ডা হচ্ছে ঢেউ। বলে লাল, সবুজ ও নীল-এই তিন রঙের ঢেউ দিয়ে আয়োজক দেশগুলোকে বোঝানো হয়েছে।
নকশায় আছে বিশ্বকাপের আয়োজক তিন দেশের জাতীয় প্রতীক=যুক্তরাষ্ট্রের তারকা, কানাডার ম্যাপল পাতা এবং মেক্সিকোর ইগল। বলের ওপর এসব প্রতীক গ্রাফিকস আকারে ও খোদাই করা হয়েছে। বলটিতে সোনালি রঙের ছোঁয়াও আছে। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে।
পুরু সেলাই ও ঠিকঠাক রেখাগুলো বাতাসে বলের চলাচল স্থিতিশীল রাখবে। খোদাই করা প্রতীকগুলো বল ভেজা অবস্থায়ও ভালো গ্রিপ করা নিশ্চিত করবে।






