গ্রামের কৃষক থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে, আনচেলত্তির ১০ অজানা গল্প

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে আজ ব্রাজিলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ক্যাম্পে কেক কাটার উৎসব। কারণ, বুধবার ৬৭ বছর বয়সে পা রাখলেন ব্রাজিল ফুটবল দলের ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। গত বছরও জন্মদিনের সময়টা জাতীয় দলের সাথেই কেটেছিল তার। ২০২৫ সালের সেই সময়ে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচ খেলছিল ব্রাজিল, যে ম্যাচ জিতেই আসলে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার প্রধান কোচ হিসেবে ডাগ-আউটে দেখা যাবে আনচেলত্তিকে। গ্রামের সাধারণ এক কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এই ইতালিয়ান মাস্টার একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। খাদের কিনারায় চলে যাওয়া ব্রাজিলকে তিনি আবারও পথে ফিরিয়েছেন। তার অধীনে হেক্সা মিশন সফলের স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিল। আনচেলত্তির জন্মদিনে রইল তার সম্পর্কে ১০টি অজানা গল্প।
১. বিশ্বকাপে তিনি আগেও ছিলেন!
কোচ হিসেবে এটি আনচেলত্তির প্রথম বিশ্বকাপ হলেও টুর্নামেন্টের ডাগ-আউটে থাকার অভিজ্ঞতা তার আগেই হয়েছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালির কোচ আরিগোর সাচ্চির সহকারী হিসেবে ডাগ-আউটে ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী আনচেলত্তি। কাকতালীয়ভাবে, সেবার ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল। ম্যাচটিতে টাইব্রেকারে হেরেছিল ইতালি। আরও একটি দারুণ মিল রয়েছে। সেবার ইতালির ক্যাম্প যেখানে ছিল, এবার ব্রাজিলের ক্যাম্পও ঠিক তার কাছাকাছি নিউ জার্সিতেই পড়েছে। ২. রিও ডি জেনিরোর সমুদ্রপ্রেম
ব্রাজিল দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আনচেলত্তি সময় ভাগ করে ফেলেছেন। একদিকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে তার স্ত্রীর সাথে যেমন থাকছেন, অন্যদিকে ব্রাজিলের সিবিএফ সদর দপ্তরের কাছে রিও ডি জেনিরোর ‘বারা দা তিজুকা’র একটি অ্যাপার্টমেন্টেও তার আবাস। সমুদ্রের ধারের এই জীবন দারুণ উপভোগ করছেন তিনি। তবে তারকাখ্যাতির কারণে একটু লুকিয়ে চুরিয়ে, মাথায় ক্যাপ গলিয়ে কাকভোরে সমুদ্র সৈকতে হাঁটতে বের হন এই ইতালিয়ান।
৩. অবসরে তিনি একজন ‘শেফ’
রান্নাবান্নার প্রতি দারুণ শখ আনচেলত্তির। বন্ধুবান্ধব ও ফুটবলারদের প্রায়ই নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন, যদিও ব্যস্ততার কারণে সব সময় তা রক্ষা করতে পারেন না। ব্রাজিলে এসে স্থানীয় স্টেকহাউস এবং ইতালিয়ান রেস্তোরাঁগুলোতে প্রায়ই ঢুঁ মারছেন। তার প্রিয় খাবারের একটি হলো ‘পোলেন্তা’ (এক ধরনের ইতালিয়ান খাবার)। তবে ব্রাজিলের খাবার নিয়ে তার একটা মৃদু আপত্তি আছে। সেখানকার পাস্তা নাকি একটু বেশিই সেদ্ধ করা হয়! খাঁটি ইতালিয়ানের মতো তার পছন্দ ‘আল দেন্তে’ (কিছুটা শক্ত রেখে সেদ্ধ করা পাস্তা)।
৪. মাঠে ধুমপান
সম্প্রতি ব্রাজিলের একটি অনুশীলন সেশনে সাইডলাইনে আনচেলত্তির ধূমপানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়। তবে এটি কোনো সাধারণ ‘ভেপ’ বা ই-সিগারেট নয়, এটি এমন এক ডিভাইস যা পুড়তে না দিয়ে তামাককে উত্তপ্ত করে। আর মূল ম্যাচের সময় নিকোটিনের এই আসক্তি সামাল দিতেই তাকে অনবরত চুইংগাম চিবোতে দেখা যায়।
৫. বহুভাষী আনচেলত্তি
বিখ্যাত এই কোচ যে দেশেই গিয়েছেন, সেখানকার ভাষা শেখাকে সংস্কৃতির অংশ করে নিয়েছেন। ব্রাজিলে যাওয়ার পর পর্তুগিজ ভাষা শেখার জন্য সপ্তাহে ৪ দিন ক্লাস করেছেন। তার শিক্ষক রবার্তো পিয়ান্তিনো জানান, স্প্যানিশ ভাষার সাথে মিল থাকায় পর্তুগিজটা দ্রুত ধরতে পারলেও মাঝেমধ্যে দুই ভাষা গুলিয়ে ফেলেন কোচ। ইতালিয়ান, স্প্যানিশ, ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় তিনি সমান সাবলীল। এমনকি বায়ার্ন মিউনিখে থাকার সুবাদে জার্মান ভাষার মৌলিক জ্ঞানও আছে তার। ৬. তিনি একজন লেখকও!
এখন পর্যন্ত ফুটবল ও নিজের জীবন নিয়ে মোট চারটি বই লিখেছেন আনচেলত্তি। ২০০৯ সালে লিখেন খেলোয়াড়ী জীবন ও প্রাথমিক কোচিং ক্যারিয়ারের গল্প নিয়ে ‘আই প্রেফার দ্য কাপ’। ২০১৩ সালে ছাপা হয় তার বিখ্যাত ৪-৩-২-১ ট্যাকটিক্যাল ফরমেশন ও কৌশল নিয়ে লেখা বই ‘মাই ক্রিসমাস ট্রি’। ২০১৬ সালে তারকাখচিত ড্রেসিংরুম কোনো একনায়কতন্ত্র ছাড়াই কীভাবে শান্তভাবে সামলাতে হয়, সেই জাদুকরী ম্যানেজমেন্টের গল্প নিয়ে লিখেন ‘কোয়াইট লিডারশিপ’। আর চ্যাম্পিয়নস লিগের রেকর্ড ভাঙা-গড়ার গল্প নিয়ে তার সর্বশেষ বই ‘দ্য ড্রিম’ প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে।
৭. শৈশব কেটেছে গ্রামে
ইতালির উত্তরাঞ্চলের রেজ্জিওলো নামের এক ছোট্ট গ্রামের কৃষক পরিবারে বড় হয়েছেন আনচেলত্তি। পড়াশোনা ও ফুটবলের পাশাপাশি জমিতে কাজ এবং গবাদি পশু লালন-পালন করে কেটেছে তার কৈশোর। আনচেলত্তি নিজেই অকপটে স্বীকার করেন, এই গ্রামীণ ও সাধারণ জীবনই তাকে শৃঙ্খলা, সরলতা এবং ধৈর্যের মতো বড় গুণগুলো শিখিয়েছে।
৮. রেকর্ডের বরপুত্র
ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র কোচ হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ ৫টি লিগেই (ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেন) ঘরোয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য রেকর্ড রয়েছে তার। এছাড়াও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের সফলতম কোচ তিনি, এসি মিলান ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে জিতেছেন রেকর্ড ৫টি শিরোপা। খেলোয়াড় হিসেবেও এই ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন দুইবার।
৯. দলে তার ভরসার প্রতীক
ব্রাজিলের কোচ হওয়ার পর গত এক বছরে তিনি মোট ৫৮ জন ফুটবলারকে ক্যাম্পে ডেকেছেন। তবে একমাত্র ক্যাসেমিরোই এমন একজন ফুটবলার, যিনি আনচেলত্তির প্রতিটি স্কোয়াড লিস্টে জায়গা পেয়েছেন। ম্যাথিউস কুনহা এবং ওয়েসলি সব লিস্টে থাকলেও চোট বা অন্য কারণে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়েছেন।
১০. ডাগ-আউটে পিতা-পুত্র
২০১৬ সাল থেকেই আনচেলত্তির ছায়া সঙ্গী হিসেবে সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করছেন তার ছেলে দাভিদে আনচেলত্তি। বায়ার্ন, নাপোলি, এভারটন ও রিয়াল মাদ্রিদ ঘুরে এবার ব্রাজিলের ডাগ-আউটেও বাবার পাশেই থাকছেন তিনি। তবে এই বিশ্বকাপই শেষ; টুর্নামেন্ট শেষেই বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফ্রান্সের ক্লাব লিলের প্রধান কোচের দায়িত্ব সামলাবেন দাভিদে।







