ফাইনালে উঠবে কে - এমবাপ্পে না ইয়ামাল

সংগৃহীত ছবি
সেমিফাইনালে লিওনেল মেসি বনাম নেইমার,এই দ্বৈরথটা দেখা যেত; যদি ব্রাজিল উঠে আসতে পারত। পর্তুগাল যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে 'কে' গ্রুপ থেকে পরের ধাপে উঠত, তাহলে হয়তো সুইজারল্যান্ডের বদলে পর্তুগালের বিপক্ষেই কোয়ার্টার ফাইনাল খেলত আর্জেন্টিনা, তাহলে হয়তো বিশ্বকাপে প্রথমবার মুখোমুখি হতে দেখা যেত মেসি আর ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে, যে দ্বৈরথের তেজ এল ক্লাসিকোকে উত্তপ্ত করে রেখেছিল ৯ মৌসুম।
প্রকৃতি শুন্যস্থান পছন্দ করে না, খুব তাড়াতাড়িই নতুন বিকল্প সামনে নিয়ে আসে। আরো বর্ণিল আরো প্রাণবন্ত রূপে। কিলিয়ান এমবাপ্পে আর লামিনে ইয়ামালের দ্বৈরথটাই হয়তো হবে নতুন যুগের মহাকাব্য। হেক্টর-অ্যাকিলিস কিংবা অর্জুন-কর্ণের দ্বৈরথ যেভাবে যুগ যুগ ধরে প্রতিদ্বন্দ্বির প্রতি শ্রদ্ধা আর নৈপুণ্যের শ্রেষ্ঠত্বের উদাহরণ হয়ে আছে, সেই এমবাপ্পে-ইয়ামাল হয়তো তারই আধুনিক মঞ্চায়ন।
ক্লাবের লড়াইয়ে এগিয়ে ইয়ামাল
বয়সে ছোট হলেও কৃতিত্বে এগিয়ে ইয়ামাল। এই স্প্যানিশ তারকার বড় হয়ে ওঠা বার্সেলোনাতেই। ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন ২০২৪ সালে। দুজনেই লা লিগায় আসার পর এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছেন ৬টি এল ক্লাসিকোতে, যার ভেতরে ৫টিতেই জয়ী হয়েছে ইয়ামালের বার্সেলোনা।২০২৪-২৫ সালে লা লিগার ম্যাচে রিয়ালকে ৪-০তে হারায় বার্সেলোনা, তাতে ইয়ামালের ১ গোল আর এমবাপ্পের ০।
এরপর ২০২৫ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনাল, বার্সেলোনা ৫-২ রিয়াল মাদ্রিদ; ইয়ামাল ২ গোল আর এমবাপ্পে ১। একই বছরের কোপা দেল রে'র ফাইনাল; ইয়ামালের ২ অ্যাসিস্ট আর এমবাপ্পের ১ গোল। ফল বার্সেলোনা ৩-২ রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগায় ফের দেখা দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর, তাতে এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করলেও ইয়ামালের দল ৪-৩ ব্যবধানে জেতে যেখানে একটা গোল ইয়ামালের। ২০২৫-২৬ মৌসুমে লা লিগায় দুই দলের দেখায় রিয়াল জিতেছে ২-১ গোলে, এক গোল করেছেন এমবাপ্পে। ২০২৫-২৬ সালের সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনা জিতেছে ৩-২ গোলে, দুজনের কেউই গোল পাননি।
ফ্রান্সের বিপক্ষেও উজ্জ্বল ইয়ামাল
ক্লাবের জার্সির বাইরে, জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামার পরিসংখ্যানেও ইয়ামাল এগিয়ে। এই দুইজনের দেখা হয়েছে জাতীয় দলে দুইবার, ২০২৪ সালের ইউরোর সেমিফাইনালে আর ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে। এই জায়গায় স্কোরটা ২-০। দুটো সেমিফাইনালেই এমবাপ্পের দলকে বিদায় করে দিয়েছে ইয়ামালের দল। ইউরোর সেমিফাইনালে স্পেন ২-১ গোলে হারায় ফ্রান্সকে, দলের একমাত্র গোলে এমবাপ্পের অ্যাসিস্ট আর সমতাসূচক গোলটা ইয়ামালের যেটা তাকে করেছে ইউরোর ইতিহাসের সবচেয়ে কমবয়সী গোলদাতা।
পরের বারের দেখা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে, ম্যাচটা স্পেন জিতেছে ৫-৪ গোলে যেখানে ইয়ামাল করেছেন জোড়া গোল আর এমবাপ্পে একটা। ব্যলন ডি অরের দৌড়ে গত আসরে ইয়ামাল হয়েছেন দ্বিতীয়, পেয়েছেন রূপার গোলক আর এমবাপ্পের সর্বোচ্চ অবস্থান ২০২৩ সালে তৃতীয়।
বিশ্বকাপে দুরন্ত এমবাপ্পে
তবে এতকিছুর পরও এমবাপ্পে একটা জায়গায় এগিয়ে। বিশ্বকাপটা এরই মধ্যে তার জেতা হয়ে গেছে। ২০১৮ সালে আবির্ভাবেই বিশ্বকাপটা জিতিয়েছেন ফ্রান্সকে, পরের বিশ্বকাপেও ফ্রান্স খেলেছে ফাইনালে আর এমবাপ্পে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। যদিও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গিয়েছিল ফরাসিরা, হয়নি শিরোপা ধরে রাখা।
এবারের আসরে ৮ গোল ও ৩ অ্যাসিস্টে এমবাপ্পে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সবার উপরে অন্যদিকে ইয়ামালের একটা গোল আর কোন অ্যাসিস্ট নেই।
স্প্যানিশ কোচ কী বলছেন
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে একদমই ভাবেন না ইয়ামালের এই পরিসংখ্যান নিয়ে, 'আমি তাকে শান্ত থাকতে বলেছি। তার তো বয়সেই হল গত বছর, তার বয়স এখন মাত্র ১৯। আমি তাকে বলেছি শান্ত থাকতে, খেলাটা উপভোগ করতে আর সব দুশ্চিন্তা ভুলে যেতে। তার উচিত নিজের খেলাটা উপভোগ করা। বিশ্বকাপে তার সেরা দিনটা আসতে এখনো বাকি।'
কোচ ফুয়েন্তে তার কাছে গোল চান না, বড় ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেয়া পারফরম্যান্স চান, ' এই বিশ্বকাপে তার জন্য এটাই সময়। তার মানে এই নয় সে একাই ১০ গোল করবে। সময়টা তার, মানে এখন বড় ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দেয়ার মত খেলার সময়।' স্পেনের সাবেক তারকা ফুটবলার জাভিও বলেছেন, ' আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই তার বয়সটা কত এবং অনেক বেশি প্রত্যাশা করে ফেলি। তবে তার সেই সামর্থ্যটা আছে। সতীর্থদের উপর প্রভাব আছে, তারা তাকে খোঁজে। মাঠে যখনই কেউ কোন সমস্যায় পড়ে, তারা তখন লামিনকে বল দেয়', ক্রীড়া ওয়েবসাইট অ্যাথলেটিক-এ প্রকাশিত কলামে লিখেছেন স্পেনের এই মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো।
প্লাতিনি-জিদানের উত্তরসূরী
অন্যদিকে জিনেদিন জিদান ও মিশেল প্লাতিনি পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের ফুটবলের সবচেয়ে বড় আইকন হয়ে উঠেছেন এমবাপ্পে। ২০১৮ সালে একসঙ্গে খেলা অলিভিয়ার জিরদ মনে করছেন, এই বিশ্বকাপে সত্যিকারের নেতা হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমবাপ্পে, 'তাকে (এমবাপ্পে) আলাদা করে তার উচ্চাকাংখা ও আত্মবিশ্বাস।সে জানে সে কোথায় যেতে চায়। সে একজন সহজাত নেতা এবং অনেক কম বয়স থেকেই তার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব আছে। সে বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত', সাবেক এই ফরাসি ফরোয়ার্ড জানিয়েছেন বিবিসিকে।
জিরুদের গড়া ফ্রান্সের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটা এমবাপ্পেই ভেঙ্গেছেন, তবে জিরুদের মনে হচ্ছে এমবাপ্পে শুধু গোল করাটাই নিজের কাজ ভাবছেন না, 'সে দারুণ সব পরিসংখ্যান জড়ো করেছে ঠিকই, কিন্তু ফ্রান্স ও দেশের বাইরে তাকে নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে—অনেকের মতেই সে এমন একজন খেলোয়াড়, যে দলের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে ফাটল ধরায়। গুঞ্জন ছিল যে তাকে বল ছাড়াও বেশি দৌড়াতে হবে এবং রক্ষণভাগেও অবদান রাখতে হবে। আর সে ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছে। এই টুর্নামেন্টে ফ্রান্স যেভাবে প্রতিপক্ষের অর্ধে উঠে হাই-প্রেস করে বল কেড়ে নিচ্ছে, সেটা তাকে ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।'
বিশ্বকাপে ব্যালন ডি’অরের লড়াই
সেমিফাইনালের আগে ইয়ামাল বলেছেন, হয় স্পেন টানা তিনবার ফ্রান্সকে হারাবে অথবা ফ্রান্স টানা তিনটা বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলবে, এই দুটোর কিছু একটা হবে। সেমিফাইনালের ফলের উপর নির্ভর করবে আরো একটা ব্যপারও। যদি ফ্রান্স জিতে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপটাও জেতে, তাহলে ব্যলন ডি'অরটা প্রথমবারের মত পাবার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হবে এমবাপ্পের। আর যদি স্পেন জিতে যায় এবং এরপর ফাইনালটাও, তাহলে গতবারের রানার্স আপ ইয়ামাল এবার ব্যলন ডি'অরটা জিতেও যেতে পারেন। তখন কিন্তু এমবাপ্পের চেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি'অর দুটোই থাকবে ইয়ামালের।




