কোচদের কোচ হয়েই থাকবেন ট্রফিশূন্য বিয়েলসা

সংগৃহীত ছবি
ফুটবলে সবার সাফল্য ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। তারা একটি দর্শন, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি বিপ্লবের নাম। মার্সেলো বিয়েলসা তেমনই। যাকে ডাকা হয় ‘এল লোচো’ বা পাগল বলে। এই ‘পাগলামি’ আসলে ফুটবল নিয়ে এক ধরনের অবসেশন। ভিডিও বিশ্লেষণ, প্রতিপক্ষকে খুঁটিয়ে পড়া, অবিশ্বাস্য কঠোর অনুশীলন, নিখুঁত প্রেসিং— সবকিছু মিলিয়ে বিয়েলসা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী স্থপতি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যার কাছ থেকে শেখা কোচরা ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফি জিতেছেন, সেই মানুষটি নিজে বড় আন্তর্জাতিক বা ক্লাব শিরোপার মালিক নন। সর্বশেষ উরুগুয়ের কোচ হিসেবে ব্যর্থতা। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে লাতিন দেশটি। তাই প্রশ্ন এসে যায়, বিয়েলসা কি শুধুই একজন শিক্ষক, যিনি শিরোপার পাল্লায় ব্যর্থ কোচ?
দলকে সাফল্য এনে দেওয়া কোচদের কাজ প্রধান। বিয়েলসা তেমন কেউ নন, বরং তিনি কোচ তৈরি করেন। অনেক বিশ্বসেরা কোচ প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, তাদের ফুটবল-চিন্তার ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিয়েলসাকে দেখে। এই তালিকায় আছেন পেপ গার্দিওলা, মাউরোসিও পোচেত্তিনো, ডিয়েগো সিমিওনে, হোর্হে সাম্পাওলি ও জেরার্দো মার্তিনোর মতো সফল কোচেরা। বার্সেলোনার কোচ হওয়ার আগে গার্দিওলা ছুটে গিয়েছিলেন বিয়েসলার কাছে। আর্জেন্টাইন কোচের সঙ্গে কথা বলেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গার্দিওলার মতে, আধুনিক প্রেসিং ফুটবলের অনেক ধারণার উৎস বিয়েলসা।
তাহলে ট্রফি আসে না কেন? মৌসুমের প্রথম ভাগে বিয়েসলার দলগুলো প্রায়ই দুর্দান্ত খেলতে থাকে। কিন্তু মৌসুম যত এগোয় ইনজুরি বাড়ে, ক্লান্তি বাড়ে, প্রেসিংয়ের তীব্রতা কমে, পারফরম্যান্স নেমে যায়। তার অধীনে লিডস ইউনাইটেডের এই প্রবণতা চোখে পড়েছিল স্পষ্ট।
বিয়েলসার দর্শনের মূল কথা হলো ‘বল হারালে সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে আনো’। হাই প্রেসিং, ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং, অ্যাটাকিং উইং প্লে, গতি, সর্বোচ্চ তীব্রতা প্রতিটি ম্যাচেই দেখতে চান তিনি। এখানে সমস্যা হলো তিনি প্রতিপক্ষ অনুযায়ী নিজের দর্শন খুব কমই বদলান। এখানেই তার শক্তি। আবার এখানেই তার দুর্বলতা।
বড় কোচদের অন্যতম গুণ প্রয়োজনে নিজেদের বদলে ফেলা। গার্দিওলা বদলান। কার্লো আনচেলত্তি কিংবা জোসে মরিনহোও বদলান। কিন্তু বিয়েলসা নিজের দর্শনে অবিচল। ফলে প্রতিপক্ষ যখন তার প্রেসিং ভেঙে ফেলে, তখন বিকল্প পরিকল্পনা সবসময় দেখা যায় না। তাছাড়া তিনি ‘সেভ ফুটবলে’ বিশ্বাস করেন না। তিনি ১-০ রক্ষা করার চেয়ে দ্বিতীয় গোল করতে বেশি আগ্রহী। ফলে তার দল কখনও অসাধারণভাবে জেতে, আবার অবিশ্বাস্যভাবে হেরে যায়।
আরেকটা ব্যাপার হলো, বিয়েসলার বড় তারকা সামলাতে না পারার দুর্বলতা। এখানে সবার আগে আসবে ২০০২ বিশ্বকাপের কথা। জাপান-কোরিয়ার সেই আসরে বিয়েলসার আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ধরা হলেও বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকে। আর্জেন্টিনার ওই দলে ছিলেন গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন, হের্নান ক্রেসপো ও হাভিয়ের জানেত্তির মতো তারকারা। তাদের একসুতোয় বাঁধতে পারেননি ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে।
ঠিক তেমনটাই এবারের উরুগুয়ে। দলে ছিলেন ফেদেরিক ভালভার্দে, দারউইন নুনেস ও রোনাল্দ আরাউহোর মতো তারকারা। উল্টো দিকে নিজের ‘ইগো’কে প্রশ্রয় দিয়ে লুইস সুয়ারেসকে দলে না রাখার সিদ্ধান্তেও অবিচল ছিলেন।
আরেকবার বিয়েসলার ফুটবল-ফুল ফুটল না বিশ্বকাপে। তাহলে কি বিয়েলসা ব্যর্থ কোচ? যদি ট্রফিই একমাত্র মাপকাঠি হয়, তাহলে বিয়েলসার ক্যারিয়ার অপূর্ণ। কিন্তু যদি ফুটবলে প্রভাব, চিন্তা, দর্শন ও উত্তরাধিকারকে মূল্য দেওয়া হয়, তাহলে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি। ইতিহাস তাকে সবচেয়ে বেশি ট্রফি জেতা কোচ হিসেবে মনে না রাখলেও স্মরণ করবে এমন এক কোচ হিসেবে— যিনি বিশ্ব ফুটবলকে শিখিয়েছেন খেলা শুধু জেতার বিষয় নয়; খেলার ধরনও একটি দর্শন।
বিয়েলসার ট্রফির আলমারি হয়তো খুব ভারী নয়, কিন্তু তার চিন্তার ভারে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ফুটবলের একটা বড় অংশ। এ কারণেই তাকে বলা হয় ‘কোচদের কোচ’।




