মেসির ৯ কোচ
কার অধীনে আর্জেন্টাইন জাদুকরের গোলের হার বেশি

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামার প্রস্তুতিতে লিওনেল মেসি। ছবি: আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন
শুরুটা হয়েছিলো হোসে পেকারম্যানের হাত ধরে ২০০৫ সালে। মাঝে কেটে গেছে ২১ বছর।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে
লিওনেল মেসির দীর্ঘ এই যাত্রায় বদলেছে
কোচ, বদলেছে দল, বদলেছে কৌশল।
বদলায়নি শুধু মেসির উপস্থিতি।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি নয়
জন কোচের অধীনে খেলেছেন। প্রতিটি কোচের সময় তার গল্প টাও ছিল ভিন্নরকম।
হোসে পেকারম্যান (২০০৫-২০০৬)
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে। তখন তার বয়স মাত্র ১৮। পেকারম্যানের হাত ধরেই জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। পেকারম্যানের অধীনে ১০ ম্যাচে ২ গোল করেন মেসি। সেই সময় তিনি নিয়মিত একাদশের খেলোয়াড় ছিলেন না। বেশির ভাগ সময় বদলি হিসেবে মাঠে নামতেন।
২০০৬ বিশ্বকাপে পেকারম্যান তাকে দলে রাখেন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ জয়ের ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেকেই গোল করেন মেসি। শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
আলফিও বাসিলে (২০০৬-২০০৮)
২০০৬ বিশ্বকাপের পর আলফিও বাসিলে দায়িত্ব নিলে মেসির ভূমিকা আরও বড় হয়। বার্সেলোনায় তখন দ্রুত আলো ছড়ানো মেসিকে তিনি নিয়মিত একাদশে জায়গা দেন। রিকেলমে, তেভেজ ও ভেরনের মতো তারকাদের সঙ্গে আক্রমণভাগে মেসির সমন্বয় গড়ে ওঠে।
২০০৭ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা দুর্দান্তভাবে ফাইনালে ওঠে। তবে শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। বাসিলের অধীনে ২৪ ম্যাচে মেসির গোল ৮টি।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা (২০০৮-২০১০)
২০০৮ সালে জুটি গড়েন আর্জেন্টিনার ইতিহাসে অন্যতম সেরা দুই তারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও মেসি। একজন ডাগআউটে আরেকজন মাঠে। সমর্থকরা আশা করেছিলো এই দুই যাদুকরের হাত ধরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সোনালি দিন ফিরে আসবে। তবে সেরকম কোনো ফল আসেনি। ম্যারাডোনার অধীনে মেসিও নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি।
তবে ম্যারাডোনা দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসির গুরুত্ব আরও বাড়ে। প্রথম দিকেই তাকে ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া হয়। পরে ২০১০ বিশ্বকাপে প্রথমবার আর্জেন্টিনার অধিনায়কও হন মেসি।
ম্যারাডোনার অধীনে ১৬ ম্যাচে মেসি করেন মাত্র ৩ গোল। তবে এই সময়েই ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তিনি দলের প্রধান তারকা হিসেবে খেলেন। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়। মেসির ব্যক্তিগত গোলও ছিল না সেই বিশ্বকাপে।
সার্জিও বাতিস্তা (২০১০-২০১১)
সার্জিও বাতিস্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসির জন্য আসে একদিকে সাফল্য অন্যদিকে জাতীয় দলের বড় হতাশা। ২০১১ সালের ঘরের মাঠের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায়। মেসিকে ঘিরে সমর্থকদের হতাশাও তখন প্রকাশ্যে আসে।
তবে বাতিস্তার অধীনেই ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে সোনার পদক জেতেন মেসি। যদিও সেটি সিনিয়র জাতীয় দলের পরিসংখ্যানে ধরা হয় না। সিনিয়র দলের হিসাবে বাতিস্তার অধীনে মেসির ১১ ম্যাচে গোল ৪টি।
আলেহান্দ্রো সাবেইয়া (২০১১-২০১৪)
২০১১ সালে আলেহান্দ্রো সাবেইয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে। তাকে কেন্দ্র করে দল সাজিয়ে আর্জেন্টিনা ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে।
ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন দলের প্রধান ভরসা। গ্রুপ পর্বে চার গোল করে দলকে নকআউটে তোলেন। এরপর সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসকে পেরিয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হেরে শিরোপা না পেলেও মেসি জেতেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল।
সাবেইয়ার অধীনে মেসি ৩২ ম্যাচে করেন ২৫ গোল। এটি তার ক্যারিয়ারে কোনো কোচের অধীনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা। প্রতি ম্যাচে গোলের হার ০.৭৮।
জেরার্দো মার্তিনো (২০১৪-২০১৬)
২০১৪ বিশ্বকাপের পর জেরার্দো ‘তাতা’ মার্তিনো দায়িত্ব নেন। তার অধীনে মেসি খেলেন টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনাল। মার্তিনোর সময় মেসির গল্পটি ছিলো বেশ হতাশার।
২০১৫ ও ২০১৬ সালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারে আর্জেন্টিনা। ২০১৬ সালের ফাইনালের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। যদিও তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফিরে আসেন। মার্তিনোর অধীনে ২০ ম্যাচে মেসির গোল ১৩টি।
এদগার্দো বাউসা (২০১৬-২০১৭)
এদগার্দো বাউসার সময়টা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মাত্র চার ম্যাচে মেসিকে পেয়েছিলেন। সেই চার ম্যাচেই মেসি করেন তিন গোল।
বাউজার অধীনে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ বাছাইয়ে চাপে পড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
হোর্হে সাম্পাওলি (২০১৭-২০১৮)
হোর্হে সাম্পাওলির অধীনে শুরুটা খুব স্বস্তির ছিল না। তবে ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডারের বিপক্ষে মেসির হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনাকে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেয়। কিটোর সেই ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে জেতে আর্জেন্টিনা।
রাশিয়া বিশ্বকাপে অবশ্য দলটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। গ্রুপে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে উঠলেও ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয়। সাম্পাওলির অধীনে ১১ ম্যাচে মেসির গোল ৭টি।
লিওনেল স্কালোনি (২০১৮-২০২৬)
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়াকে সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছেন লিওনেল স্কালোনি। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব নেওয়া এই কোচ ধীরে ধীরে মেসিকে কেন্দ্র করে নতুন আর্জেন্টিনা গড়ে তোলেন।
২০১৯ কোপা আমেরিকায় তৃতীয় হওয়ার পর আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়। ব্রাজিলের মারাকানায় ফাইনালে স্বাগতিকদের হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপা-খরা কাটায় আর্জেন্টিনা। সেটিই ছিল মেসির সিনিয়র জাতীয় দলের প্রথম বড় শিরোপা।
এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয়। একই বছর কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপও জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। মেসি পুরো টুর্নামেন্টে সাত গোল করে গোল্ডেন বল জেতেন এবং ফাইনালেও দুই গোল করেন।
২০২৪ কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়াকে হারিয়ে আবারও চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বড় টুর্নামেন্ট ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে, যদিও শিরোপা জিততে পারেনি।
স্কালোনির অধীনে মেসি ৭৯ ম্যাচে ৬০ গোল করেছেন। এই পরিসংখ্যান-ই বলে দেয় স্কালোনির অধীনে কতটা উজ্জ্বল ছিলেন তিনি।
মেসির কোচভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি ছিলেন মূলত সম্ভাবনাময় তরুণ। পেকারম্যানের অধীনে ১০ ম্যাচে ২ গোল থেকে শুরু করে সাবেলার অধীনে ৩২ ম্যাচে ২৫ গোল এবং শেষ পর্যন্ত স্কালোনির অধীনে ৭৯ ম্যাচে ৬০ গোল। গোল গড় ০.৭৬ — এই সংখ্যাগুলোই তার ঐতিহাসিক বিবর্তনের গল্প বলে।
এই হিসাবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোল স্কালোনির অধীনে। আর সবচেয়ে বেশি গোল-গড় সাবেইয়ার অধীনে—০.৭৮। তিনিই প্রথম মেসিকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনাকে খেলানোর কৌশল ঠিক করেছিলেন এবং অনেকখানি সফলও হয়েছিলেন। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালটা উতরাতে পারলেই হয়তো দৃশ্যপটে অন্য কোনো কোচের আসাও হতো না।
পেকারম্যানের সময় বদলি হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখা তরুণ মেসি পরে বাসিলের অধীনে নিয়মিত একাদশের খেলোয়াড় হন। ম্যারাডোনা তাকে ১০ নম্বর জার্সি ও অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দেন। সাবেইয়ার সময় তিনি হয়ে ওঠেন দলের প্রধান ভরসা। আর স্কালোনির অধীনে শুধু দলের তারকা নয়, পুরো আর্জেন্টিনা দলের খেলার কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।






