ঋতুর বামপন্থায় গোলের সুরভি

একঝাঁক নারী দেশের ফুটবলকে অভাবিত সুদিন উপহার দিয়ে চলছে। ২০২২ ও ২০২৪ নারী সাফ জয়ের ধারাবাহিকতায় এখন তারা হ্যাটট্রিক শিরোপার মঞ্চে। আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা একদল ফুটবলারের উপাখ্যান লিখতে গেলে প্রথমেই আসবে এক জাদুকরের কথা। ঋতুপর্ণা চাকমা; যার বাঁ পা বারবার দেশকে নিয়েছে নতুন উচ্চতায়। যে পায়ে জন্ম হয়েছে দুর্দান্ত এক অলিম্পিক গোলের।
বাংলার ফুটবলের পোস্টার গার্ল ঋতু। ছিলেন ২০২২-এ সাফ জয়ী দলের সদস্য। পরের সাফেই বাজিমাত। ২০২৪-এর ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে অভাবনীয় এক গোলে শিরোপা নিশ্চিত করেন। কাঠমান্ডুতে যে স্বপ্নযাত্রার শুরু, তা এগিয়ে নিচ্ছেন রাঙামাটির দুর্গম পাহাড় থেকে উঠে আসা ঋতু। পরের বছর মিয়ানমারে তার ঝলকে বাংলাদেশের নাম ওঠে ইতিহাসের পাতায়, এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তিন ম্যাচে করেন ৫ গোল। শক্তিশালী মিয়ানমারের বিপক্ষে জোড়া গোল দেশকে দেয় অবিস্মরণীয় অর্জনের আনন্দ।
ঋতুর বাঁ পা কথা বলেছে এশিয়ান কাপের মূল মঞ্চেও। গ্রুপের প্রথম ম্যাচের ১৪ মিনিটে চীনের প্রাচীর প্রায় ভেদ করে ফেলেছিলেন এই ফরোয়ার্ড। ৩০ গজ দূর থেকে হাওয়ায় ভাসানো শট কোনোমতে ঠেকান চীনের গোলকিপার।
এবারের সাফে মালদ্বীপের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তার অলিম্পিক গোলের চেষ্টা রুখে দিয়েছিল পোস্ট। ভারতের ম্যাচেও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। বুধবার সেমিফাইনালের শুরুতে ছিলেন বোতলবন্দি। খোলস ছেড়ে বের হন প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে। ডান দিক থেকে তার কর্নার বাঁক খেয়ে ঢুকে যায় গোলে, অনেকটা লাফিয়েও আটকাতে পারেননি নেপালি গোলকিপার। এটিই দলের ম্যাচে ফেরার জ্বালানি। পরে সাগরিকার গোল বাংলাদেশকে নিয়ে যায় ফাইনালে।
বামপন্থায় অপূর্ব সৃষ্টি
প্রিয় শিষ্য ঋতুর অলিম্পিক গোলে অবাক হননি নারী ফুটবল জাগরণের নেপথ্য নায়ক গোলাম রব্বানী ছোটন, ‘ওকে এমন গোল করতে দেখে অবাক হইনি। নেপালে ফাইনালে জয়সূচক গোল করেছে। এ ম্যাচেও একই গোলকিপারকে একইভাবে বিভ্রান্ত করেছে। তার বাঁ পা কখন যে কী করে ফেলে, আল্লাহই জানেন। একেবারে গড গিফটেড (ঈশ্বর প্রদত্ত)।’ এই তারকার সাবেক সতীর্থ সানজিদা আক্তারও করেছেন ঋতুর বামপন্থার গল্প, ‘তার দূর থেকে হুটহাট গোল করাটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। সে ছোটবেলা থেকে বাঁহাতি। বাঁ হাতে লেখে, চুল বাঁধে, বাঁ পায়ে খেলে। লেফট ফুটাররা বল হাওয়ায় বাঁক খাওয়াতে ভালো জানে। এর সঙ্গে ঋতুর সেটপিসও অনেক নিঁখুত।’ সানজিদার চাওয়াতেই ২০২২ সাফ জেতার পর ছাদখোলা বাসে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। এর পর থেকে চলটা রয়ে গেছে। এবার দর্শক হয়েও ছাদখোলা বাসে ঋতুদের হাতে শিরোপা দেখতে চান সানজিদা।
অলিম্পিক গোল করা মামুনুল কী বলছেন
অলিম্পিক গোলের দেখা নিয়মিত মেলে না। এ দেশে তো আরও না। তারপরও ছেলেদের ফুটবলে এমন কীর্তি আছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল হকের। ২০০৮ কলম্বো সাফে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭৫ মিনিটে অলিম্পিক গোলে বাংলাদেশকে ১ পয়েন্ট এনে দেন বাঁ পায়ের মামুনুল। লিগে আরও তিনটি অলিম্পিক গোল করা মামুনুল ঋতুর প্রশংসা করে বলেন, ‘অলিম্পিক গোল সবাই পায় না। সেই সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ঋতু অলিম্পিক গোল করে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছে। এমন গোল নিজের ও দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।’
ঋতুর কাছেও অলিম্পিক গোল সেরা
ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে করেছেন ১৪ গোল। তবে ঋতু অলিম্পিক গোলকে রাখছেন সবার ওপরে। এরপর ২০২৪ সাফের ফাইনালের সেই অভাবনীয় গোল, ‘আমার কাছে অলিম্পিক গোলটা ছাপিয়ে গেছে ২০২৪ ফাইনালের গোলটিকে। এরপর মিয়ানমারের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে করা জোড়া গোল আর ২০২৪ সাফের সেমিতে ভুটানের বিপক্ষে করা দ্বিতীয় গোলটি সেরা।’
ঋতুর বাঁ পা দ্যুতি ছড়ালে শনিবার গোয়ায় আরেকবার রচিত হবে ভারতবধ কাব্য। উদযাপন হবে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের।





