বিদায় রোমান্টিক ফুটবলশিল্পী

নেইমার জুনিয়র
তার পায়ে বল মানে ডিফেন্ডারদের সঙ্গে এক অলিখিত নাচ, এক ধরনের স্পর্ধা ও একরাশ আনন্দ। সবুজ ক্যানভাস হয়ে ওঠে এক অসম্ভব ফুটবল কল্পনার ছায়াছবি। ফুটবলের সেই রোমান্টিক চিত্রশিল্পীটি ঘোষণা দিলেন, ‘আমার গল্প শেষ।’
বলছি, রোমান্টিক ফুটবল শিল্পী নেইমার জুনিয়রের বিদায়ের গল্প। বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি লিখেছেন আনন্দের উপাখ্যান, ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে গড়েছেন গোলের নতুন ইতিহাস। শিল্প আর বিনোদনের অপূর্ব মিশেলে ফুটবল রাঙিয়ে এই তারকা বিদায় নিচ্ছেন শূন্য হাতে। নেই সোনালি ট্রফির গৌরব, নেই একটি ব্যালন ডি’অর।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হতাশাজনক বিদায়ের পর তার স্বপ্ন ভেসে গিয়েছিল চোখের জলে। ইনজুরির সঙ্গে লড়ে মানুষের ভালোবাসায় এই তারকা ঢুকেছিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। কিন্তু শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে হারের পরপরই যেন থেমে যায় হলুদ জার্সিতে নেইমারের দীর্ঘ পথচলা। নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সেদিন তিনি আবেগে-আক্ষেপে ভেসে গিয়েও একরকম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ‘এখানে আমার শুরু হয়েছিল। এখনেই শেষ হলো।’ ওই স্টেডিয়ামে ২০১০ সালে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে শুরু হয়েছিল তার পথচলা।
এরপরও সেলেসাও সমর্থকদের মধ্যে ক্ষীণ আশা ছিল। পরশু সান্তোসের হয়ে কোপা সুদামেরিকার ম্যাচ শেষে সেই সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে দিয়ে বলেছেন, ‘জাতীয় দলের আমার পথচলা শেষ। আমি ইতিহাস গড়েছি, আমি সুখী ছিলাম। আমার রক্ত দিয়েছি, জীবন দিয়েছি। সবসময় এই জার্সির জন্য লড়েছি। কিন্তু এখন আর আমি খেলতে চাই না।’ সেই চিরচেনা ১০ নম্বর হলুদ জার্সির চঞ্চল, বাঁকা হাসির জাদুকর বিদায় নিলেন নীরবে। ক্লাব ফুটবল খেললেও ৩৪ বছর বয়সী এই তারকাকে আর দেখা যাবে না জাতীয় দলে।
পেলের সাম্বা ফুটবল আর গারিঞ্চার ছন্দের যে উত্তরাধিকার ব্রাজিল যুগ যুগ ধরে বহন করে আসছে, তার শেষ খাঁটি প্রতিনিধি ছিলেন নেইমার। হলুদ জার্সিতে তার অনন্য অধ্যায়। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮টি অ্যাস্টিস্ট— এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এক প্রজন্মের স্বপ্ন, উল্লাস আর অগণিত প্রত্যাশার ছবি। এই গল্পটি আরও গৌরবময় হতে পারত ২০১৪ বিশ্বকাপে। নিজের দেশের মাঠে নেইমার দুর্দান্ত ফর্মে, যেন প্রতি ম্যাচে নিজের কাঁধে ছুটছেন ব্রাজিলের স্বপ্নকে। কোটি সমর্থকের বিশ্বাস নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল তার পায়ের চারপাশে। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান সুনিগারের নির্মম ফাউলে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান নেইমার। ব্রাজিল সেমিফাইনালে উঠলেও স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল আগের ম্যাচেই। এরপর তিনি আরও অনেকবার ফিরেছেন, বিশ্বকাপে গেছেন, গোল করেছেন, কিন্তু ২০১৪ সালের বিকালে যে স্বপ্ন ভেঙেছিল, তা আর পূর্ণতা পায়নি।
অথচ একসময় তাকে ভাবা হতো লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে। সান্তোসের সমুদ্রসৈকত থেকে উঠে এসে তিনি প্রথমে সান্তোস ও পরে বার্সেলোনা মাতিয়ে অসম্ভব সব কীর্তি গড়েছিলেন। তার প্রতিটি ড্রিবলে ছিল বিস্ময়, ফ্লিকে ছিল কল্পনার সীমানা ভাঙার সাহস। বার্সায় তার সবই ছিল— শিরোপা, সাফল্য ও সমর্থকদের ভালোবাসা। কিন্ত ওখানে ছিলেন লিওনেল মেসিও। মাঠের মধ্যমণি। তাই নিজেকে আলাদা করতে বা মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি জিততে পাড়ি জমান প্যারিস সেন্ত জার্মেইয়ে। কিন্তু ভাগ্য তার পাশে দাঁড়ায়নি। ইনজুরি হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। একের পর এক চোটে ছয় মৌসুমে মাঠের বাইরে ছিলেন ১০০টিরও বেশি ম্যাচে। যে অধ্যায়ে তার একক ফুটবল রাজত্ব গড়ার কথা ছিল, সেখানে তিনি হয়ে উঠলেন গল্পের ট্র্যাজিক হিরো।
এই ব্রাজিলিয়ানের প্রতিভা নিয়ে কোনোদিনই প্রশ্ন ওঠেনি। প্রশ্ন ছিল ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা নিয়ে। কিছু পেতে গেলেই যেন বাগড়া দিয়েছে ইনজুরি। তিনি জিতেছেন কোটি মানুষের হৃদয়, উপহার দিয়েছেন অসংখ্য মুহূর্ত। কিন্তু সর্বোচ্চ প্রাপ্তিগুলো বরাবরই অধরা থেকে গেছে। তাই নেইমার যেন এক অপূর্ণ সিম্ফনি— যার সুর অসাধারণ, কিন্তু শেষ স্তবকটি যেন অসমাপ্ত থেকে গেল।








