বিশ্বকাপ
শঙ্কা কাটিয়ে শিরোপার স্বপ্ন ইয়ামালের

এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট স্পেন। তরুণদের নিয়ে গড়া লা রোহাদের শক্তিশালী দল নিজেদের প্রমাণ করতে মরিয়া। কিন্তু বিশ্বকাপ দল ঘোষণার আগমুহূর্তে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছিল দে লা ফুয়েন্তের দল। যাকে অনেকে স্পেনের প্রাণস্পন্দন বলেন, সেই লামিন ইয়ামালই অনিশ্চিত ছিলেন বিশ্বকাপে। এপ্রিলের শেষ দিকে ম্যাচ চলাকালে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েন বার্সেলোনার এ তারকা। গুঞ্জন উঠেছিল ইয়ামাল নাকি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে পারেন।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল ইনজুরির সেই সময়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে ছিলেন শঙ্কায়, ‘আমার মনে আছে যখন আমি আহত হয়েছিলাম, তখন মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, যেন এটা গুরুতর কিছু না হয়। যেন শুধু সামান্য পেশিতে টান বা অন্য কিছু হয়, কারণ বিশ্বকাপের মুহূর্তটা খুব কাছে চলে এসেছে। যদিও আমি জানতাম, এটা হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি, যা আমার আগে কখনো হয়নি, কিন্তু আমি এটাও জানতাম, সেরে উঠতে বেশি সময় লাগবে।’
এই তরুণ ফরোয়ার্ড চোট পাওয়ার পরের সেই প্রথম মুহূর্তগুলোর মানসিক চাপ নিয়েও কথা বলেছেন, ‘তাই আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে, এটা গুরুতর কিছু হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, যদি গুরুতর না-ও হয়, আমার চোট আবার ফিরে আসতে পারে এবং আমি বিশ্বকাপ খেলতে না-ও পারি।’
শুধু ইয়ামাল না, ভেতরে ভেতরে এমন দুশ্চিন্তায় ছিল গোটা স্পেন। কোচ থেকে শুরু করে সতীর্থ সবার কপালেই ভাঁজ পড়ে যায়। তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্পেন দল যদি একটি নৌকা হয় তাহলে সেটার মাঝি হলেন ইয়ামাল। নৌকার মাঝি ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছানো কল্পনা করাও অসম্ভব।
আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে, এটা গুরুতর কিছু হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, যদি গুরুতর না-ও হয়, আমার চোট আবার ফিরে আসতে পারে এবং আমি বিশ্বকাপ খেলতে না-ও পারি -লামিন ইয়ামাল
ইয়ামালকে মাঝি বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বয়স মাত্র ১৮, তাই বলে তাকে উপেক্ষা করার যে সুযোগ নেই তা এরই মধ্যে বুঝতে পেরেছে ফুটবল বিশ্ব। ২০২৪ সালের ইউরোতে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স এখনো হৃদয়ে গেঁথে রেখেছেন স্পেন সমর্থকরা। সেমিফাইনালে তার বাঁ পায়ের দূরপাল্লার শটটি বিশ্বমঞ্চে তার উপস্থিতির জানান দিয়েছিল। সেই টুর্নামেন্টের পর থেকে আর ইয়ামালকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
শুধু স্পেনের প্রাণস্পন্দন বললে ভুল হবে, কারণ তিনি যে একই ভূমিকা পালন করছেন বার্সেলোনাতেও। জিতেছেন তিনটি লা লিগা শিরোপাসহ ছয়টি ট্রফি। এ মৌসুমে লিগ শিরোপায় তার অবদান ১৬ গোল এবং ১১ অ্যাসিস্ট। সব মিলিয়ে কাতালান ক্লাবের হয়ে ১৫১ ম্যাচে ৪৯ গোল এবং ৫২ অ্যাসিস্ট আছে এই উইঙ্গারের। মাত্র ১৮ বছরের কিশোরের জন্য এটা অকল্পনীয় পরিসংখ্যান!
পরিসংখ্যানই বলে দেয় তাকে স্পেনের মাঝি বলা যৌক্তিক এবং তার ইনজুরির কারণে সমর্থকদের মাথায় হাত দেওয়াটাও স্বাভাবিক। বার্সেলোনার মেডিকেল টিম শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে বিশ্বকাপ খেলতে তেমন কোনো বাধা নেই এই ১৮ বছর বয়সীর। তাতে অনেকটা স্বস্তি ফেরে স্প্যানিশ সমর্থকদের। তবে পুরোপুরি ফিট হওয়ার জন্য বিশ্বকাপের আগে ইরান এবং পেরুর বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ এবং কেপ ভার্দের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে খেলবেন না তিনি। সব ঠিক থাকলে ২১ জুন সৌদি আরবের বিপক্ষে তার বিশ্বকাপ অভিষেক হতে যাচ্ছে।
আসন্ন বিশ্বকাপে ইয়ামালের মাঠে প্রভাব থাকবে অতুলনীয়। তিনি শুধু গোল করেন না, তার চেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন। ইউরো ২০২৪-এ সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট ছিল তার। স্পেনের ডান প্রান্তের আক্রমণ ইয়ামালনির্ভর। স্পেনের বিপক্ষে কোনো দল চূড়ান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেললে তখন দলের একমাত্র ভরসা ইয়ামালের ওয়ান-অন-ওয়ান দক্ষতা।
ইউরো জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবার বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাবান ট্রফি জিততে চান ইয়ামাল। তিনি জানিয়েছেন, তারা দল সম্পূর্ণ প্রস্তুত স্পেনকে দ্বিতীয় শিরোপা উপহার দেওয়ার জন্য, ‘অবশেষে সেই মুহূর্ত চলে এসেছে। ইউরো শেষ হওয়ার পর থেকেই আমরা সবাই এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আমরা বিশ্বকাপে যাচ্ছি এবং শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়েই সর্বশক্তি উজাড় করে লড়ব।’
স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামাল সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যেন জাদুর কাঠি দিয়ে তাকে স্পর্শ করেছেন।’
ইয়ামাল তার জাদু দেখিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে পারেন কি না, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে ফুটবল বিশ্ব।







