ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো
কখনও আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকলে নিজেকে স্বার্থক ভাববো
- শেষ পর্যন্ত ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, মানুষ নিয়েই ফুটবল।
- পর্তুগিজ হওয়া মানে এই তো- আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই, চলুন আমরা আবার স্বপ্ন দেখি!
- ৭ নম্বর জার্সিটি থেকে গেল, তবে এটি পরার যে গর্ব, তা চিরকাল আমারই থাকবে।
- যে দেশ ক্রমাগত নতুন বীর সৃষ্টি করে যেতে পারে, সে দেশ নিজের ওপর বিশ্বাস কখনোই হারায় না।

সংগৃহীত ছবি
সহযাত্রী পর্তুগিজ ভাইবোনেরা, জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার দিনটি আজ এসে গেছে। আমি কখনই এটিকে শুধু নিজের বলে মনে করিনি। তবে ২৩ বছর ধরে এটি গায়ে জড়ানোর, এর মান রক্ষা করার এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের স্টেডিয়ামে এটিকে বহন করার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল। আজ, এই জার্সিটি ভবিষ্যতের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না, কারণ কিছু সিদ্ধান্ত কেবল মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, সেগুলো হৃদয় দিয়েও অনুভব করতে হয়। ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে শুরু হওয়া এবং আমার জীবনকে চিরকালের মতো বদলে দেওয়া এক অবিশ্বাস্য যাত্রার এখানেই ইতি ঘটছে।
পেছনে ফিরে তাকিয়ে জাতীয় দলের হয়ে আমার অভিজ্ঞতার কথা যখন ভাবি, তখন চোখে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড বা ট্রফিগুলো ভেসে ওঠে না। আমি দেখতে পাই মানুষকে। আমি দেখতে পাই সেই প্রবাসীদের, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও পর্তুগালের একটু কাছাকাছি অনুভব করতেন। আমি দেখতে পাই কোটি কোটি পর্তুগিজকে—যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখিনি, অথচ যারা আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছেন। কারণ শেষ পর্যন্ত ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, মানুষ নিয়েই ফুটবল।
জাতীয় দলের হয়ে আমার পুরো ক্যারিয়ারে আমি নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি জিততে চেয়েছি, সেরা হতে চেয়েছি, ইতিহাস গড়তে চেয়েছি। আমি সবসময় নিজের কাছে আরও বেশি দাবি করেছি, আরও বেশি কিছু চেয়েছি। সবসময় বিশ্বাস করেছি যে আমরা আরও দূরে যেতে পারি। এই জার্সির জন্য আমি আমার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। কিছু দারুণ দুপুর ও সন্ধ্যা গেছে, কিছু জয় আমি কখনো ভুলব না। কিছু হার আজও আমার মনে কষ্ট দেয়। আমি ভুলও করেছি, কষ্টও পেয়েছি। এমন সময়ও গেছে যখন পর্তুগিজ জনগণ খুব করে যা চেয়েছিল তা আমি দিতে পারিনি। কিন্তু আমি কখনোই হাল ছেড়ে দিইনি। আর সবার ওপরে, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমার গর্বে বুক ভরে ছিল।
এই বছরগুলোতে আমি কিছু সত্য অনুভব করতে পেরেছি। গোল আসে, ট্রফিগুলো মিউজিয়ামে জমা হয়, রেকর্ড একসময় ভাঙে। কিন্তু এমন একটি জিনিস আছে যা সময় কখনো মুছে ফেলতে পারে না—তা হলো মানুষের হৃদয়ে করে নেওয়া আমাদের জায়গা। আমি যদি কখনো আপনাদের আনন্দ দিয়ে থাকি, আমার কোনো গোলের পর আপনারা যদি কাউকে জড়িয়ে ধরে থাকেন, কোনো দুশ্চিন্তা দূর করে থাকেন, কিংবা দেশের জন্য গর্ববোধ করে থাকেন—তবে এই সবকিছু সার্থক ছিল। কারণ পর্তুগিজ হওয়া মানে এই তো- আমরা একসঙ্গে কষ্ট পাই, একসঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই, চলুন আমরা আবার স্বপ্ন দেখি!
পর্তুগালের এমন তরুণদের সবসময় প্রয়োজন হবে যারা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। এমন খেলোয়াড়দের প্রয়োজন হবে যারা কখনো হার মানে না। এমন নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন হবে যারা বিশ্বাস করে যে আগে কেউ যেখানে পৌঁছায়নি সেখানেও যাওয়া সম্ভব। কারণ যে দেশ ক্রমাগত নতুন বীর সৃষ্টি করে যেতে পারে, সে দেশ নিজের ওপর বিশ্বাস কখনোই হারায় না।
জাতীয় দলে আমার সতীর্থদের আমি বিশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই। প্রতিটি স্প্রিন্ট, আলিঙ্গন, বিতর্ক, মাঠে নামার আগের প্রতিটি নীরব মুহূর্ত, একসঙ্গে উদযাপন করা প্রতিটি জয় এবং হার যা আমাদের আরও শক্তিশালী করেছে—সেসবের জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা হাঁটে না, আর আপনারা সবাই আমার গল্পের একটি অংশ।
যারা বছরের পর বছর ধরে আমার সঙ্গে কাজ করেছেন—সেই সব কোচ, ম্যানেজার, ডাক্তার, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার, স্টাফ এবং আরও কত মানুষকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের অনেকেই হয়তো ছবিতে আসেননি, কিন্তু আপনাদের ছাড়া সেই ছবিগুলোর একটিও তোলা সম্ভব হতো না।
আমার পরিবারকে ধন্যবাদ, এই স্বপ্নটি আমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। অনুপস্থিতি, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় দলের পেছনে আমার সময় দেওয়ার কারণে তোমাদের যে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি, তা সহ্য করার জন্য ধন্যবাদ। আমি যদি এতদূর আসতে পেরে থাকি, তার কারণ তোমরা আমার সঙ্গে
আর বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত পর্তুগিজ ভাইবোনদের উদ্দেশ্যে শেষ একটি কথা বলতে চাই। একটি দৃশ্য আমার মনের কোণে চিরকাল গেঁথে থাকবে, জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার মুহূর্তটি। আমি চারপাশে তাকাই, আমার সহকর্মীদের দেখি, গ্যালারির দিকে তাকাই, শিশু, মা, বাবা ও দাদা-দাদিদের দেখি। দেখি সেই সব পর্তুগিজদের যারা দূর-দূরত্ব থেকে সেখানে ছুটে এসেছেন।
আর সেই কয়েকটি মিনিটে আমরা আর আলাদা কেউ থাকি না। সেখানে কোনো ক্লাব থাকে না, দলীয় রঙ থাকে না, শ্রেণিভেদ থাকে না, পেশা বা মতামত থাকে না। সেখানে শুধু একটাই আবেগ থাকে, পর্তুগাল। এই অনুভূতিটিই আমি বাকি জীবন আমার সঙ্গে বহন করে নিয়ে যাব।
আজ জাতীয় দলের হয়ে মাঠে আমার সময় ফুরিয়ে এল। মাথা উঁচু করে, নিজের যাত্রায় গর্বিত হয়ে এবং পর্তুগালের জন্য আমি আমার সর্বস্ব দিয়েছি—এই শান্তি নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি। কিন্তু আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকব চিরকাল। আপনাদের মতোই আমি প্রতিটি পর্তুগালের জয়ের আনন্দে শিহরিত হব, কষ্ট পাব এবং ‘সিউ’ ধ্বনিতে তা উদযাপন করব।
আমি বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য সারা জীবন সাধনা করেছি। আজ আমি বুঝতে পেরেছি যে আমার সবচেয়ে বড় বিজয় হলো বিশ্বের সেরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। এই ২৩ বছরের জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। ছোট্ট একটা ছেলে হিসেবে মাদেইরাতে ফুটবলের পেছনে ছুটে চলা আমার যে স্বপ্ন, তা সত্যি করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
৭ নম্বর জার্সিটি থেকে গেল, তবে এটি পরার যে গর্ব, তা চিরকাল আমারই থাকবে। পর্তুগাল সবসময় আমার হৃদয়ে থাকবে। বিদায়।



