তরুণদের হাতে ফুটবলের নতুন ভোর

ভারতকে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি জিতেছে বাংলাদেশ। ছবি: আগামীর সময়
শনিবার সন্ধ্যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে তখন উৎসবের ঢেউ। হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে শত শত ফুটবলপ্রেমী অপেক্ষা করছেন তাঁদের বীরদের জন্য। মালদ্বীপের মালে থেকে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি বুকে নিয়ে সবে অবতরণ করেছে বাংলাদেশ দল। একটু পরেই সুসজ্জিত ছাদখোলা বাসে চড়ে মিঠু চৌধুরী - রোনান সুলিভানরা যখন রাজপথে বের হলেন, ঢাকার রাস্তা পরিণত হলো উৎসবের নগরে।
এটি কেবল একটি সংবর্ধনা ছিল না। এটি ছিল ইতিহাস। বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পুরুষ ফুটবল দলকে ছাদখোলা বাসে সম্মাননা দেওয়া হলো। এর আগে কেবল সাফজয়ী নারী ফুটবল দলই এই বিরল গৌরব পেয়েছিল। ছাদখোলা বাস থেকে হাত নাড়া তরুণ খেলোয়াড়দের দেখে সেদিন বোঝা গেল বাংলাদেশের ফুটবল সত্যিই বদলাচ্ছে।
৩ এপ্রিল রাতে মালদ্বীপের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল, তা দীর্ঘদিন মনে থাকবে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের। ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে দলকে টানা দ্বিতীয় শিরোপা এনে দিলো মিঠু, সুলিভান, চন্দন, মাহিনরা। রোনান সুলিভানের চোখধাঁধানো পানেনকা শটেই লেখা হলো দেশের ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।
সিনিয়র এবং বয়সভিত্তিক খেলায় বাংলাদেশ ফাইনালে একবারই হারিয়েছিল ভারতকে। সেটা ২০১৫ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে। আর বয়সভিত্তিক খেলায় ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৫ তিনটি ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ছিল শুধু হারের বেদনা। এবার সেই দীর্ঘ গ্লানির চাদর সরিয়ে টানা দ্বিতীয়বার সাফ অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা এসেছে লাল-সবুজের ঘরে।
২০২৪ ও ২০২৬ দুটি বিজয়ী স্কোয়াডেই ছিলেন গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিন, মিডফিল্ডার চন্দন রায় এবং ডিফেন্ডার আশরাফুল হক আসিফ। তাদের আনন্দটা এজন্য দ্বিগুণ। মাহিন বিশেষভাবে আলাদা। ফাইনালের টাইব্রেকারে তাঁর প্রথম সেভটিই ঘুরিয়ে দিয়েছিল ম্যাচের মোড় ।
এই প্রসঙ্গেই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সংবর্ধনা মঞ্চ থেকে স্মরণ করিয়ে দিলেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের কথা। ২০০৩ সালে তিনি নিজেই ছিলেন বাংলাদেশ দলের গোলরক্ষক, যে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বাংলাদেশ জিতেছিল একমাত্র সিনিয়র সাফ শিরোপা। সেদিনও ছিল পেনাল্টি ঠেকানোর গল্প। তেইশ বছর পর মাহিনের সেভে যেন সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি দেখলেন প্রতিমন্ত্রী। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেছেন অর্জন করার চেয়ে অর্জন ধরে রাখা অনেক কঠিন কাজ, এই তরুণদের কাছে তিনি ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করেন।
পুরো টুর্নামেন্টে যাঁর নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রোনান সুলিভান। নানি বাংলাদেশি হওয়ার সুবাদে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামা এই তরুণ কেবল গোলই করেননি, তৈরি করেছেন ইতিহাস। পাকিস্তানের বিপক্ষে দুর্দান্ত ফ্রি-কিক ও হেডে দুই গোল এবং ফাইনালে টাইব্রেকার বুদ্ধিদীপ্ত পানেনককা শট, প্রতিটি মুহূর্ত ছিলো বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র কয়েকদিন আগে, তবু মানিয়ে নিয়েছিলেন সহজে।
সংবর্ধনা মঞ্চে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে অধিনায়ক মিঠু চৌধুরী বললেন, "এই ট্রফি আপনাদের জন্য। শুধু আপনাদের জন্য।" উপস্থিত হাজার দর্শকের করতালিতে ফেটে পড়লো হাতিরঝিলের আকাশ। তাদের চোখ এখন এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে।
মালদ্বীপেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা গ্যালারি ভরিয়ে রেখেছিলেন লাল-সবুজ পতাকায়। তাই হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে ডেকলান সুলিভান মাইক হাতে নিয়ে তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার কাছে বাংলাদেশের সমর্থকরাই বিশ্বের সেরা।
এই সাফল্যের স্বীকৃতিও এসেছে দ্রুত। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় আরও ৫০ হাজার টাকা। আগামী ৬ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া দিবসে এই পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেবেন প্রতিমন্ত্রী নিজে।
২০০৩ সালে আমিনুল হকের গ্লাভস থেকে ২০২৬ সালে মাহিনের গ্লাভস, মাঝে কেটে গেছে তেইশটি বছর। বাংলাদেশের সিনিয়র ফুটবল এখনো সেই ঐতিহাসিক সাফ শিরোপার পুনরাবৃত্তির অপেক্ষায়। কিন্তু মিঠু, মাহিন, চন্দন, রোনানরা যেভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছেন, তাতে সেই দিন বোধহয় আর বেশি দূরে না।
ছাদখোলা বাসে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে যাওয়া এই তরুণরা কেবল একটি শিরোপা জেতেনি বরং তারা দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলের আলো কোথায়। সেই আলোর নাম তারুণ্য। সেই আলোর নামই ভবিষ্যৎ।















