স্মৃতির বিশ্বকাপ
টোটাল ফুটবলের বিশ্বকাপ ট্র্যাজেডি

১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ফুটবল দলটি টোটাল ফুটবলের প্রতীক
এ যেন সোনার পাথরবাটির মতোই অলীক। অথচ ঘোর বাস্তব। ফুটবল দর্শনকে আমূল বদলে দেওয়া এক চিন্তার নাম টোটাল ফুটবল। যে ফুটবলের চর্চা করেছে হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া এবং নেদারল্যান্ডস। এই টোটাল ফুটবলের দর্শনের ওপরই পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা হয়েছে বিশ্বসেরা। তবে টোটাল ফুটবল বিশ্বকাপ জেতাতে পারেনি, এটাই খুব সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
ফুটবল মাঠে গোলরক্ষক বাদে বাকি ১০ জন খেলোয়াড়দের কোচ মাঠে সাজান পরিকল্পনা মাফিক। কোচের ছকে কেউ রক্ষণভাগের খেলোয়াড়, কেউ মাঝমাঠের, কেউ আক্রমণভাগের। টোটাল ফুটবলের যে দর্শন, তা বদলে দিয়েছিল ফুটবলের এই মৌলিক জায়গাটাকেই। টোটাল ফুটবলে একমাত্র গোলরক্ষক বাদে কারও পজিশনই নির্দিষ্ট নয়। অনেক তাত্ত্বিক কচকচানি আছে, তবে সোজা বাংলায় বললে এটাই টোটাল ফুটবল যেখানে গোলরক্ষক বাদে বাকি ১০ জন খেলোয়াড়দের দলের প্রয়োজনে রক্ষণ, মাঝমাঠ কিংবা আক্রমণভাগ; যেকোনো ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হতে হয়। ধরে নেওয়া হয়,এই কৌশলের সূত্রপাত অস্ট্রিয়ান ফুটবল কোচ হিউগো মেইসির মাথা থেকে। ১৯৩০'র দশকের শুরুর দিকে ইংরেজ কোচ জিমি হোগান ও তার বন্ধু মেইসি মিলে এই কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। এই কৌশলের কার্যকারিতার খ্যাতি অস্ট্রিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় হাঙ্গেরিতে, যেখানে গুস্তাভ সেবেজের কোচিংয়ে ১৯৫০-এর দশকের হাঙ্গেরির 'ম্যাজিকাল ম্যাগায়ার্স' এই কৌশলকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়।
টোটাল ফুটবলের কৌশল অবলম্বন করেছে অনেক ক্লাবও। ১৯৪০'র দশকে ইতালির তোরিনো, ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার রিভারপ্লেট, ডাচ লিগের ক্লাব আয়াক্সসহ অনেক ক্লাবেই কোচরা এই কৌশল অবলম্বন করেছেন। ক্লাব পর্যায়ে আয়াক্সে রাইনাস মিশেল ও বার্সেলোনায় পেপ গার্দিওলা এই কৌশলকে দিয়েছেন পূর্ণতা, তবে জাতীয় দলে টোটাল ফুটবল ট্র্যাজেডি হয়েই রয়ে গেছে। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হাঙ্গেরির হার ফুটবল ইতিহাসে পরিচিত 'বার্ন-এর অলৌকিক সেই ঘটনা' নামে।
ফুটবল বিশ্লেষকরা এখনো মনে করেন, সোনালি প্রজন্মের হাঙ্গেরিকে পশ্চিম জার্মানির হারিয়ে দেওয়াটা রীতিমতো অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। সেসময় হাঙ্গেরি অলিম্পিক সোনা জয়ী, তখন অলিম্পিকে এখনকার মতো অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলত না। ১৯৫৩'র ইউরোর ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ওয়েম্বলিতে ৬-৩ গোলে ধসিয়ে দিয়ে এসেছিল হাঙ্গেরি। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত থেকে মাত্র সেরে ওঠা পশ্চিম জার্মানি, যারা আগের বিশ্বকাপে খেলেনি আর দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই ছিলেন অপেশাদার, জীবিকা নির্বাহের জন্য ফুটবল খেলার পাশাপাশি অন্য কোনো চাকরি বা ব্যবসা করতে হতো। বিশ্বকাপের আগে খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলারও সুযোগ পাননি পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা। অথচ তারাই ফাইনালে হারিয়ে দিল স্যান্দর ককসিস, ফেরেঙ্ক পুসকাস, নান্দোর হিদেকুটিদের হাঙ্গেরিকে। বলা হয় বার্নের বৃষ্টিভেজা সেই ফাইনালে অ্যাডিডাসের সরবরাহ করা জুতাই গড়ে দিয়েছিল ব্যবধান। অ্যাডিডাসের জুতায় ছিল অ্যাডজাস্টেবল স্ক্রু-ইন-স্টাডস, বৃষ্টিভেজা মাঠে এই সামান্য প্রযুক্তিগত পার্থক্যই গড়ে দিয়েছিল হারজিতের পার্থক্য।
১৯৪০ এর দশকে জ্যাক রেনল্ডস নামে এক ইংরেজ কোচ ডাচ লিগের দল আয়াক্সে টোটাল ফুটবল কৌশলে খেলাতে শুরু করেন। তাতে সাফল্যও আসে। রেনল্ডসের দলে খেলেছেন রাইনাস মিশেল, ১৯৬৫ সালে মিশেল কোচ হন আয়াক্সের। ১৯৭০ সালের পর মিশেল টোটাল ফুটবলের ছক কষতে শুরু করলেন, কারণ ততদিনে তিনি পেয়ে গেছেন ইয়োহান ক্রুইফকে। সেন্টার ফরোয়ার্ড ক্রুইফকে পুরো মাঠ জুড়ে খেলার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন মিশেল।
ক্রুইফের নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডস ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে মানুষের হৃদয় জিতলেও কাপ জিততে পারেনি। মিশেলের টোটাল ফুটবল মিউনিখের ফাইনালে হোঁচট খায় পশ্চিম জার্মানির সামনে। তবে ২-১ গোলে ফাইনাল হারের কারণ হিসাবে ‘পুল পার্টি স্ক্যান্ডাল’র কথা অনেকেই বলেন। ম্যাচের দুদিন আগে বিখ্যাত জার্মান ট্যাবলয়েড ‘বিল্ড’ প্রকাশ করে এক বিস্ফোরক খবর। ক্রুইফসহ কয়েকজন ডাচ ফুটবলার সুইমিং পুলে নগ্ন নারীদের সঙ্গে পার্টি করেন। এই খবরটি বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে ডাচ শিবিরে। খেলোয়াড়দের স্ত্রী-বান্ধবীরা ফোন করতে থাকেন দেশ থেকে। ক্রুইফের স্ত্রী ড্যানি ক্রুইফ নাকি এই খবরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং ফাইনালের আগের রাতটি ক্রুইফ ফোনে কাটিয়েছেন স্ত্রীকে শান্ত করতে। যাই হোক, নেদারল্যান্ডসের দুর্দান্ত দলটি পারেনি বিশ্বকাপে টোটাল ফুটবলের সিলমোহর মারতে।
চার বছর পর অস্ট্রিয়ান কোচ আর্নেস্ট হ্যাপেল এই কৌশলকে আরও পোক্ত করলেন। তারপর এলো ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ। আরও একবার টোটাল ফুটবলের শিরোপা স্বপ্নভঙ্গ। হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙেছিল প্রকৃতি, ডাচদের স্বপ্ন ভাঙ্গে মানুষ।
১৯৭৮সালের বিশ্বকাপ শুরু থেকেই প্রবল সমালোচিত আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক হোর্হে ভিদেলা ও তার অনুচরদের নানা অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে। গোটা বিশ্বকাপ জুড়েই আর্জেন্টিনা পক্ষপাতদূষ্ট রেফারিংয়ের আশীর্বাদ ভোগ করেছে। সেবার সেমিফাইনাল ছিল না, ছিল গ্রুপ পর্ব। পেরুর জালে ৬ গোল দিয়ে তারা গোল ব্যবধানে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে ফাইনালে ওঠে। ব্রাজিলকে গোল ব্যবধানে পেছনে ফেলার জন্য ম্যাচটা পাতিয়েছিল আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা। সেজন্য পেরুর সরকারকে আর্জেন্টিনার সরকার বিনা শর্তে মোটা অঙ্কের ঋণ দেয়, খাদ্য সাহায্য দেয়, খেলোয়াড়দের ঘুষ দেয়, কাউকে কাউকে আর্জেন্টিনার লিগের দলে মোটা অঙ্কে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এভাবেই ফুটবলকে কলঙ্কিত করে ফাইনালে ওঠার পেছনের দরজা বেছে নেয় স্বাগতিক আর্জেন্টিনা। এরপর ফাইনালে প্রশ্নবিদ্ধ রেফারিং জিতিয়ে দেয় তাদের।
টোটাল ফুটবলের আত্মিক উত্তরসূরী বলা যায় পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনাকে। তবে ২০১০ সালে স্পেন যে কৌশলে বিশ্বকাপ জিতল সেটা মোটেও টোটাল ফুটবল নয়। ভিসেন্তে দেল বস্ক তার দলের খেলোয়াড়দের পজিশন মোটেও অদলবদল করেননি। জাভি হার্নান্দেস, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সের্হিও বুশকেৎজ নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছেন।নিজেদের ভেতর ক্রমাগত পাস আদান-প্রদান করে বলের দখল ধরে রাখলেও তারা টোটাল ফুটবলের মতো গোটা মাঠ জুড়ে জায়গা অদল-বদল করে খেলেননি।
টোটাল ফুটবল এক নস্টালজিয়া। এমন এক কৌশল যা প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করে, তাদের সব পরিকল্পনাকে অকেজো করে দেয়। যেন ফুটবল মাঠে জ্যামিতিক নকশার নিখুঁত বুনন। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কোচের ড্রয়িং বোর্ড থেকে ফুটবলারদের পায়ে এই কৌশল বিকশিত হয়েছে, ক্লাব পর্যায়ে এনে দিয়েছে সাফল্য। কিন্তু বিশ্বকাপে টোটাল ফুটবল মানেই যেন টোটাল ট্র্যাজেডি।






