বাবার স্বপ্ন নিয়ে বোলার হান্টের মঞ্চে খুদে চায়নাম্যান

বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের ডান দিকে সাইফ ছবিঃ মোশারফ হোসেন
সাইফের বয়স ৯। খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চলে তার বসবাস, স্থানীয় স্কুলে সে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। পল অ্যাডামস সবশেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন ২০০৪ সালে, সাইফের জন্মের প্রায় ১৩ বছর আগে। খুব স্বাভাবিকভাবেই পল অ্যাডামসের খেলা দেখে তার মতো বাঁহাতি চায়নাম্যান বোলার হওয়ার অনুপ্রেরণা পাওয়ার সুযোগ সাইফের হয়নি। তাই বোলার হান্টের মঞ্চে এ খুদে বোলারের কণ্ঠে যখন শোনা গেল তার বোলিং স্টাইল চায়নাম্যান এবং প্রিয় বোলার পল অ্যাডামস, তখন কৌতূহলী না হয়ে উপায় নেই! এরপর যখন সাইফ বলল সে গুগলি বলে তামিম ইকবালকে আউট করতে চায়, যে মানুষটা বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হিসেবে মঞ্চের ঠিক সামনেই বসে আছেন, তখন তার সাহসের তারিফ না করেও থাকা গেল না।
ছোট সাইফের চ্যালেঞ্জ তামিম ইকবালকে!
একটি মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘বোলার হান্ট’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান। মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়াম সেজেছে বর্ণিল আলোয়। মাথার ওপর চক্কর কাটছে ড্রোন, হঠাৎ উড়ে যাওয়ার শব্দে মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বুঝি ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে! ৫টার অনুষ্ঠান ৬টায় শুরুর পর বক্তৃতা আর নানান সময়ক্ষেপণের পর যখন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের মঞ্চে ডাকা হলো, তখন দীর্ঘদেহী পেসারদের মাঝে নজর কাড়ল দুই খুদে বোলার।
লম্বা পেসারদের সঙ্গে ছোট্ট সাইফ ছবি : মোশারফ হোসেন
তাদেরই একজন সাইফ। সবাই যখন একে একে নিজের পরিচিতি জানাচ্ছিল, তখন সাইফের কণ্ঠে ‘লেফট আর্ম চায়নাম্যান’ শব্দটা অবাক করল। এত কম বয়সে এই বোলিং স্টাইলের কথা নিঃসন্দেহে অনেক পোড়খাওয়া সাংবাদিকও জানতেন না! তার কাছে উপস্থাপক কাজি সাবিরের জিজ্ঞাসা, ‘প্রিয় বোলার কে?’ উত্তরে পল অ্যাডামসের নাম শুনে আরেকবার অবাক হওয়ার পালা। ‘কোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের উইকেট নিতে চাও?’ এ প্রশ্নের উত্তর ‘তামিম ইকবাল।’ বিসিবি সভাপতি পুরস্কার দিতে এসে খুঁজেছেন সাইফকে, ‘কে আমাকে আউট করতে চায়?’ সাইফকে কাছে ডেকে জানতে চেয়েছেন, ‘আমাকে কোন ডেলিভারিতে আউট করবে?’ সাইফের জবাব, ‘গুগলি।’ তামিমও পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছেন, ‘আমি কিন্তু গুগলি ভালো রিড করতে (পড়তে) পারি।’
কৃষক বাবার স্বপ্ন ছেলে হবে ‘চায়নাম্যান’
তামিমের সঙ্গে সাইফের কথোপকথন শুনে মনেই হতে পারে, নিশ্চয়ই কোনো ক্রিকেট একাডেমির ঝানু কোনো কোচের কাছেই তালিম নিচ্ছে ৯ বছর বয়সী এই খুদে প্রতিভা। তবে সত্যিটা হচ্ছে, খাগড়াছড়ির দুর্গম এক অঞ্চলে থাকা সাইফ কৃষক পরিবারের ছেলে। তার বাবা শাহজাহান শুভ পারিবারিক কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছের ব্যবসা করেন। কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেননি। নিজের এলাকায় ক্রিকেট খেলার জ্ঞান আর ইউটিউবকে কাজে লাগিয়ে ছেলেকে কোচিং করান। শুভ বলেছেন, ‘লেফট আর্ম চায়নাম্যান বিরল প্রজাতির বোলার, আল্লাহ যখন আমাকে ছেলে সন্তান দিয়েছেন তখন থেকেই আমার ইচ্ছা তাকে ক্রিকেটার বানাব এবং চায়নাম্যান বোলার বানাব।’
সাইফের বাবা শাহজাহান শুভ ছবি : মোশারফ হোসেন
এবার সাইফের কাছেই শোনা যাক তার বোলার হান্টের অভিজ্ঞতা, ‘ট্রায়াল দিয়েছি চট্টগ্রাম থেকে। আগের দিন খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রামে এসে এক চাচ্চুর বাসায় ছিলাম। বাবা মাঠে নিয়ে গেছে। আমার বাবাই আমাকে অনুশীলন করায়। আব্বু ওরকম বড় কোনো পর্যায়ে খেলেনি তবে এমনি মাঠে খেলত। সকালে স্টেডিয়ামে গেলাম, অনেক লম্বা লাইন ছিল। লাইনে আমার সিরিয়াল আসার পরে স্টিকার লাগিয়েছি, এরপর ভেতরে ঢুকেছি। ভেতরে ঢোকার পর কোচরা বলল ট্রায়াল দিতে, দিলাম। বল করলাম। প্রথম রাউন্ডে চারটা বল করেছি আর দ্বিতীয় রাউন্ডে ছয়টা।’
কেন চায়নাম্যান বোলিং করা সেটাই সাইফের কাছ থেকে শোনা গেল, ‘আমার বাবা বলেছে, লেফটআর্ম চায়নাম্যান পৃথিবীতে অনেক কম, পাওয়াই যায় না। এজন্য আমার বাবা আমাকে লেফট আর্ম চায়নাম্যান বানিয়েছে।’ পল অ্যাডামসের নাম বিসিবির কোচদের কাছেই শুনেছে সাইফ, ব্র্যাড হগ বা কুলদীপ যাদব কারও নামও সাইফ শোনেনি।
পাহাড়েও প্রকট পল অ্যাডামস!
ছেলেকে নিয়ে অনেক আশা বাবা শুভর। জানালেন, চট্টগ্রামে পল অ্যাডামসের খেলা দেখেই তার চায়নাম্যান বোলিং নিয়ে আগ্রহের সূত্রপাত, ‘আমি চট্টগ্রামে পল অ্যাডামসের খেলা দেখেছি ২০০২ সালে (আসলে ২০০৩, সেই টেস্টে অ্যাডামস ১০ উইকেট নিয়েছিলেন), তারপর থেকে আমার মধ্যে একটা চিন্তা জাগল যে, আমি এরকম বোলার হতে পারি কি না। আমি নিজে হতে পারিনি, দুর্ভাগ্য। এরপর আল্লাহ আমাকে যখন ছেলে সন্তান দিল, তখন থেকেই আমার ইচ্ছা তাকে চায়নাম্যান বোলার বানাব।’
বন্ধুর সঙ্গে সাইফ (বামে) ছবি : মোশারফ হোসেন
বোলার হান্টের মাধ্যমে বিসিবির প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে যদি স্কুলের পড়ালেখাতেও ব্যাঘাত ঘটে, সেটাও মেনে নেবেন, ‘আমার (ছেলের) পড়ালেখায় যদি একটু ঘাটতিও হয়, তাহলেও ওকে আমি অংশগ্রহণ করতে দেব।’ খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার একটি গ্রামে থাকেন শুভ। সেখানে শুভই তার ছেলের কোচ। তবে বছর দেড়েক ধরে বিসিবির খাগড়াছড়ি জেলার কোচ মুজাহিদ বাবুর কাছে সপ্তাহে এক দিন করে যাচ্ছে সাইফ, সেটা আবার তাদের বাড়ি থেকে ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থায় লোকাল বাস বা মোটরবাইকে করে সপ্তাহে এক দিন ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছেন শুভ। বাকিটা সময় নিজেই শেখান ছেলেকে, ‘আমার যতটুকু ক্রিকেট জ্ঞান আছে, টুকটাক যা খেলেছি, ওকে দেখার পর আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে ওকে যেসব নির্দেশনা দিয়েছি, দেখলাম যে সে ওগুলো কাজে লাগাতে পারছে। এখন মোটামুটি সফল। বোলার হান্টের সেরাদের মধ্যে আমার ছেলে একজন।’
স্বপ্ন কোনো বাঁধ মানে না
পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্তা বলেছেন, বোলার হান্টের বিজয়ীদের মোবাইলে এক বছর ফ্রি ইন্টারনেট দেবেন। মানিকছড়ি উপজেলা সদর ও প্রধান বাজার অঞ্চলে চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট থাকলেও ভেতরের গ্রামগুলোতে পর্যাপ্ত সিগন্যাল স্ট্রেন্থ নেই, পার্বত্য এলাকায় যা খুবই স্বাভাবিক। তাই বিনে পয়সার ইন্টারনেটে শুভ বা সাইফের খুব একটা লাভ হবে না।
বিজয়ের মঞ্চে সাইফ
বিজয়ীদের একজন হিসেবে ক্রেস্ট ছাড়া আর্থিক কোনো পুরস্কার আছে কি না, জানতে চাইলে আগামীর সময়কে শুভ বলেছেন, ‘টাকাপয়সা দেবে কি না দেবে এটা জানি না, আমার ছেলে বোলার হান্টে টিকেছে, এখন আয়োজকরা বুঝবে, বিসিবি বুঝবে ওকে কীভাবে অনুশীলন করাবে। আসা-যাওয়ার কোনো খরচ আয়োজকরা দেয়নি। আর্থিক কষ্ট যতই হোক, নিয়ে আসতেই হবে। আর্থিক সামর্থ্য বলতে আমি অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসছি, আমি একজন কৃষক মানুষ, কেউ তো মুখ দিয়ে প্রকাশ করবে না সামর্থ্য আছে কি না নাই।’
সাইফের বাবা শুভ চান, তার ছেলের প্রতিভাটা যেন কাজে লাগে, ‘আমি চাই তার সেরা প্রশিক্ষণ, যেভাবে তার ভালো হয়। বিকেএসপিতে দিলে অথবা বিসিবি নিজের কাছে রেখে তাকে অনুশীলন করালে, যেভাবে তার ভালো হবে সেটাই আমার চাওয়া।’ সব বাবাই তার সন্তানদের ভালো চান। শুভ তো শুধু বাবা নন, কোচও। তার অপূর্ণ স্বপ্নটাই তিনি পূরণ করতে দেখতে চান সাইফকে। যে স্বপ্নটা তিনি দেখেছিলেন ২৩ বছর আগে, চট্টগ্রাম টেস্টে পল অ্যাডামসের বোলিং দেখে।







