ভালো খেলা যেন ফুরিয়ে না যায়

টানা তিন দিন ভালো খেলেছে বাংলাদেশ, সেটিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ণশক্তির দলের বিপক্ষে। বাংলাদেশ দল মাঠে নামার আগে যদি কেউ এমন ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে আশাবাদী মানুষদের তালিকায় স্থান দেওয়া যেত। বরং আলোচনাটা ছিল পাঁচ দিনের টেস্ট কয়দিনে শেষ হবে? শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আর সমালোচকদের চুপ করিয়ে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়ে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
তিন দিন ধরে ভালো খেলা বাংলাদেশ যেন শেষে এসে ভুল করে না বসে, এ রকমই প্রত্যাশা মেহেদী হাসান মিরাজের। টেস্টে নিজের দশম হাফসেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিনে, বল হাতে নিজেই ক্যাচ ধরে ফিরিয়েছেন অস্বস্তির কাঁটা হয়ে ওঠা স্টিভেন স্মিথকে। হাসান মাহমুদ, তানজিদ হাসান তামিমের পর তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় আরেক ‘হাসান’, মেহেদী হাসান মিরাজ। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে জানালেন, ভালো খেলাটা যেন আরও অন্তত দুটো দিন ধরে চলে।
ব্যাটিংয়ের সময় মিচেল স্টার্কের সঙ্গে বেশ কয়েকবার জড়িয়েছেন কথার লড়াইয়ে। কতদূর গড়িয়েছে জল, জানতে চাইলে মিরাজ বলেছেন, এখন সব স্বাভাবিক ‘গতকাল (শুক্রবার) তেমন কিছু হয়নি। ব্যাটিং করার পর ও সামনে চলে এসেছিল। আমিও ওকে দেখতে পাইনি। উইকেটের ভেতর দৌড়ে রান নিয়েছিলাম। খেলার মাঠে এসব হতেই পারে। আজ (গতকাল) সকালে ও আমার সঙ্গে কথা বলেছে। কালকের (শুক্রবার) বিষয় নিয়ে বলেছে— আমারও ভুল হয়েছে, ইটস ওকে।’
বাংলাদেশের অভাবনীয় পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তিদের প্রশংসা কানে এসেছে কি না, জানতে চাইলে বলেছেন, ‘আমরা খুব ভালো ক্রিকেট খেলছি গত কয়েক দিন ধরেই। এখানে সব কিংবদন্তিরা খেলা দেখছেন। ওরা অন্যতম সেরা দল। সর্বোচ্চ শক্তি নিয়েই খেলছে। বাংলাদেশ এমন একটা মুহূর্ত পেয়েছে, আমরা ভালো করছি— খুব ভালো লাগছে। আরও দুই দিন আছে। ভালো খেলা যেন শেষ না হয়ে যায়। সেই চেষ্টাই করছি।’ আরও দুটো দিন ভালো খেললে অস্ট্রেলিয়া নিশ্চিতভাবেই হেরে যাবে ডারউইনে। তবে প্রতিপক্ষকে সম্মান দেওয়ার রেওয়াজটা আছে অস্ট্রেলিয়ার। তাই নিশ্চিত করেই বলা যায়, উত্তরসূরিদের হারিয়ে দিলেও প্রশংসায় কমতি রাখবেন না মার্ক ওয়াহ, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, রিকি পন্টিংরা।
নিজের ব্যাটিংটা নিয়ে মিরাজ বললেন, ‘আমরা ভালো ব্যাটিং করেছি। আমার জন্য কঠিন ছিল। আমি ক্রিজে গেছি, ২ রান তখন মুশফিক ভাই আউট হয়ে গেছে। যা রান করেছি, বোলারদের নিয়েই করেছি। আমার জন্য একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল ওই মুহূর্তে রান করাটা।’ দুই পেসার, হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদকে নিয়ে ৪৬ রানের দুটো জুটি গড়েছেন মিরাজ, তার ব্যাটেই লিডটা বড় হয়েছে বাংলাদেশের।
তিন দিনের খেলা শেষ। চতুর্থ দিনে উইকেটে ভাঙন ধরে, স্পিনাররা সুবিধা পায়। মিরাজ আশা করছেন, তাইজুল ইসলামের সঙ্গে জুটি বেঁধে তুলে নিতে পারেন অস্ট্রেলিয়ার বাকি ছয়টি উইকেটও, ‘এখনো বেশি টার্ন করছে না। স্পিনাররা শুধু ধৈর্য রেখে বল করার চেষ্টা করছি ভালো জায়গায়। এখানে রান আটকালে উইকেটের সম্ভাবনা বাড়বে। আমি ও তাইজুল ভাই চেষ্টা করেছি ভালো বল করার। ওরা ১ রান করলেও তো আমাদের ওপর প্রভাব পড়বে।’ ৬৭ রানে এখনো পিছিয়ে অস্ট্রেলিয়া, তাদের কত রানের ভেতর আটকে রাখতে চান— এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আমরা তো চাইব যত কম রান হয়। এখনো খেলার দুই দিন বাকি। ৬ উইকেট বের করা গুরুত্বপূর্ণ। ওরা সবাই ভালো ব্যাটিং করে। যত সময় যাচ্ছে উইকেট ভালো হচ্ছে। বেশি টার্গেট নিয়ে না ভেবে ছোট ছোট লক্ষ্যে এগোনোর চেষ্টা করছি।’
মাউন্ট মঙ্গানুইতে, আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপার মুকুট মাথায় রাখা নিউজিল্যান্ড দলকে যে বাংলাদেশ হারিয়ে দেবে সেটা কে-ই বা ভেবেছিল! সেই অসাধ্য সাধনের ম্যাচে মিরাজ অবদান রেখেছিলেন ব্যাটে-বলে, সব্যসাচী ভূমিকায়। ডারউইনেও হাফসেঞ্চুরি, স্মিথের উইকেট; সবকিছু আশাবাদী করে তুলেছে তাকে, ‘আমরা সবাই বিশ্বাস করেছি, আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারি, ভালো ক্রিকেট খেলব। প্রত্যেকের মধ্যে এই বিশ্বাস ছিল। মুশতাক (আহমেদ, স্পিন বোলিং কোচ) ভাই সবসময় এই কথা বলে ও সাপোর্ট দেয়, বলেন বিশ্বাস রাখতে সবসময়। দলে ভালো খেলোয়াড় আছে। এই সিরিজ উপভোগের চেষ্টা করছি। ফলাফল পরের বিষয়, এই মুহূর্ত উপভোগের চেষ্টা করছি। কেউ কিছু চিন্তা না করলে তো করে দেখানোও সম্ভব না। আমরাও ভাবছি এই ম্যাচ জেতা সম্ভব। রেফারেন্স হিসেবে দেখুন, নিউজিল্যান্ডে আমরা ম্যাচ জিতেছিলাম। আমরা পারি, করেছি। ওই বিশ্বাস থেকেই এসেছে।’ পুরো দলের ভেতর এখন ম্যাচ জয়ের বিশ্বাস ওড়াউড়ি করছে।






