ওয়াংখেড়ে ভুলবে না ম্যাক্সওয়েলকে

সংগৃহীত ছবি
সেই সন্ধ্যায় তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন ছেলেবেলায় সেই কবিতা, ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’। আক্ষরিক অর্থেই তিনি সেই ম্যাচে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক পায়ে। পা চলছিল না, চলেছে শুধু হাত। কব্জির অবিশ্বাস্য জাদুতেই মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল গড়েছেন রূপকথা। আফগানিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত সেই ২০১, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলার দিনে আবারও স্মৃতির পাতায় সেই মহাকাব্যিক ইনিংস।
৭ নভেম্বর, ২০২৩। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে আফগানরা। ২৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে লজ্জাজনক হারের মুখে অজিরা। ক্রিজে তখন ম্যাক্সওয়েল-কামিন্স জুটি। কত রানে হারবে অস্ট্রেলিয়া, সে নিয়েই চলছে আলোচনা।
ইনিংসের শুরুতেই বেশ কয়েকবার জীবন পান ম্যাক্সওয়েল। নূর আহমেদের বলে একটি নিখুঁত এলবিডব্লিউ রিভিউ থেকে বেঁচে যান। ৩৩ রানের মাথায় শর্ট ফাইন লেগে মুজিব উর রহমান তার একটি সহজ ক্যাচ মিস করেন।
এই মিসের মূল্য যে এভাবে দিতে হবে, তা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি আফগানদের কেউ। ম্যাক্সওয়েল একাই টেনে নিলেন অজিদের ইনিংস। অন্য প্রান্তে কামিন্স যেন সেই রাতে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কিছুতেই মাথা গরম করবেন না। যেভাবেই হোক, ক্রিজে টিকে থাকতেই হবে। বলের পর বল, ওভারের পর ওভার তিনি টিকে গেলেন।
এক প্রান্তে কামিন্সের ঠাণ্ডা মাথার ব্যাটিং, অন্যদিকে ম্যাক্সির তাণ্ডব। আফগান বোলাররা তখন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে ম্যাক্সওয়েল তুলে নিলেন সেঞ্চুরি। ঝিমিয়ে পড়া অজি সমর্থকরা একটু নড়েচড়ে বসলেন।
সেঞ্চুরির পর থেকেই বেশ অস্বস্তি বোধ করছিলেন ম্যাক্সওয়েল। রান নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ঠিকঠাকভাবে পা নাড়াতে পারছিলেন না। মাঠ ছেড়ে যে চলে যাবেন, সে উপায়ও নেই। তিনি মাঠ ছাড়লেই যে দলের হার নিশ্চিত।
মুম্বাইয়ের ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্রতা; এই দুইয়ে ম্যাক্সওয়েল তখন বিপর্যস্ত। পায়ের ক্র্যাম্পে এক রকম খোঁড়া তিনি। কোনভাবেই যেন হাঁটু বাকাতে পারছিলেন না।
ফিজিও মাঠে বারবার ছুটে এলেও এক চরম ক্লান্ত ও পানিশূন্য দেহের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের খুব বেশি কিছু করার ছিল না।
উইকেটের মাঝে দৌড়ে রান নেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়লে ম্যাক্সওয়েল একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। দৌড়ে রান নেওয়া বন্ধ করে শুধুই চার-ছক্কার দিকে মনোযোগ দেন। আর এতেই যেন আফগানদের সর্বনাশের চূড়ান্ত।
এক পায়ে দাঁড়িয়ে ম্যাক্সওয়েল হয়ে ওঠেন অতিমানব। ভাগ্যদেবীও যেন সেদিন তার সঙ্গে ছিল। ব্যাটে লাগলেই বল চলে যাচ্ছে বাউন্ডারির বাইরে। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যেখানে ম্যাক্সওয়েলের আউট না হওয়ার কোন যুক্তিই কেউ খুঁজে পাচ্ছিলেন না!
ব্যাক ও হাতের কবজির শক্তি ব্যবহার করে ৯০ মাইল গতির বলকে রিভার্স-সুইপ করে শর্ট থার্ড-ম্যানের ওপর দিয়ে পাঠানো, ডিপ মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকানো; মুম্বাইয়ের দর্শক এমন কিছু হয়তো আগে কখনোই দেখেনি।
এক পর্যায়ে দৌড়াতে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। কিছুতেই উঠছেন না ম্যাক্সওয়েল। ড্রেসিংরুমে তখন চিন্তার ভাঁজ, কী হলো তার! রেসলিংয়ের সেই আন্ডারটেকারের মতো কয়েক সেকেন্ড পর উঠে দাঁড়ালেন, ওয়াংখেড়েতে তখন দর্শকের চিৎকারে কান পাতা দায়!
ম্যাক্সওয়েল তার খেলা চালিয়ে গেলেন। কামিন্স তখন আরও ধীরে খেলছেন। তার ৬৮ বলে ১২ রানের সেই ইনিংসটি যেন সেঞ্চুরির চেয়েও মহামূল্যবান।
জয়ের জন্য তখন সামান্য কিছু রান বাকি। আর ম্যাক্সওয়েল অপরাজিত ১৯৫ রানে। অজিদের জয় তখন মোটামুটি নিশ্চিত। পুরো স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে। এক সিনেমাটিক স্টাইলে ম্যাচের সমাপ্তি টানেন ‘বিগ শো’। ৪৭তম ওভারে মুজিব উর রহমানের বলকে বিশাল এক ছক্কায় মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠান।
ধারাভাষ্যে থাকা ইয়ান স্মিথের সেই কয়েক লাইন যেন ম্যাক্সওয়েলের পুরো ইনিংসকে ফুটিয়ে তোলে, ‘তার একা মাঠ ছাড়া উচিত নয়, সতীর্থদের উচিত তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া’।
ম্যাক্সওয়েল অবশ্য একাই মাঠ ছেড়েছেন। ২১ চার, ১০ ছক্কায় ১২৮ বলে ২০১; ওয়ানডে তো বটেই, ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ব্যাটিং আগে কেউ দেখেছে কিনা, তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে।
পুরো ক্যারিয়ারে সমালোচনা পিছু ছাড়েনি তার। ‘মাথা গরম’ ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে কিছু হবে না, অস্ট্রেলিয়া দলে তিনি জায়গা পাওয়ার যোগ্য নন; শুনতে হয়েছে অনেক কিছুই। ম্যাক্সওয়েল অবশ্য সবকিছুর জবাব দিয়েছেন ব্যাটেই। মুম্বাইয়ের সেই ইনিংসটা ছিল সবচেয়ে বড় জবাব।
৩৮ বছর বয়সে দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্রিকেট যাত্রার ইতি টানলেন ম্যাক্সওয়েল। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি; তিন ফরম্যাটেই অজিদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ম্যাক্সি। টেস্টে মাত্র ৭ ম্যাচে মাঠে নেমেছেন, ২৬.০৮ গড়ে করেছেন ৩৩৯ রান, উইকেট ৮টি। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ১৪৯ ম্যাচে রান ৩৯৯০, গড় ৩৩.৮১। উইকেট পেয়েছেন ৭৭টি। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ম্যাক্সওয়েল মাঠে নেমেছেন ১৩০ ম্যাচে, ২৮.৯৭ গড়ে করেছেন ২৮৯৭ রান। বোলিংয়ে নেমে নিয়েছেন ৫১ উইকেট।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর দেখা যাবে না তাকে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সেই ইনিংসের রেশ থেকে যাবে বহুকাল।





