দুরন্ত হাসান, উড়ন্ত বাংলাদেশ

‘টেস্টে দারুণ সব জয় আছে বাংলাদেশের। কিন্তু এটাই কি তাদের টেস্টের সেরা দিন’— ফক্স স্পোর্টসের ধারাভাষ্যে ডেভিড ওয়ার্নারকে প্রশ্নটা করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক অ্যালিসা হিলি। ওয়ার্নারের জবাব, ‘আমরা মিরপুরে ওদের কাছে টেস্ট হেরেছি। আমি সেঞ্চুরি করেও বাঁচাতে পারিনি দলকে।
নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানকেও ওরা হারিয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন দাপটের দিনটা অন্যতম সেরা হয়ে থাকবে ওদের টেস্ট ইতিহাসে।’
ডারউইনের সবুজ উইকেটে সোনালি সাফল্যের নায়ক হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে এই পেসার কাঁপিয়েই দিয়েছেন টস জিতে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে। আগুন ঝরিয়েছেন তাসকিন আহমেদ আর ইবাদত হোসেনও। তিন পেসার ১০ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দিয়েছে ১৯৮ রানে। বাংলাদেশ প্রথম দিন শেষ করেছে ১ উইকেট হারিয়ে ৯৬ রানে।
অস্ট্রেলিয়া সর্বশেষ সাত টেস্টে এ নিয়ে ২০০ রানের কমে অলআউট হলো সাতবার। তাদের নড়বড়ে ব্যাটিংয়ের ফায়দাটা ভালোভাবেই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। তারপরও সকালে ঘুম থেকে জেগে চোখ কচলে কেউ স্কোরকার্ড দেখলে মায়াবী বিভ্রমে পড়তেই পারেন! কে ভেবেছিল, প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ এভাবে থাবা বসাবে পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়ার ওপর?
নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রতিপক্ষের ১০ উইকেট নিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। প্রথমটি ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সেই ইনিংসেও ৫ উইকেট নিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। তবে চোটের জন্য নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলামরা না থাকায় এবারের সাফল্যের মাহাত্মটা অন্যরকম। ‘এক্সে’ সে কথাই লিখেছেন ভারতীয় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হার্শা ভোগলে, ‘ভারতে হাসান মাহমুদকে দেখে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। নাহিদ রানা না থাকলেও বাংলাদেশ যে তাদের শক্তির গভীরতা প্রমাণ করেছে, সেটা সত্যি অসাধারণ।’
এই ম্যাচে খেলার কথা ছিল না ইবাদত হোসেনের। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকতে ছুটি নিয়েছিলেন তিনি। সেই ইবাদত দলে ফিরে নিয়েছেন ২ উইকেট। মার্নাশ লাবুশেন ও অ্যালেক্স ক্যারিকে ফিরিয়ে তার বিখ্যাত ‘স্যালুট’ উদযাপন তাই হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। আর ক্যামেরন গ্রিনকে ফিরিয়ে দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদের যে অদ্ভুত উদযাপন, সেটা তো ভাইরাল ক্রিকেট দুনিয়া জুড়েই।
এই ভেন্যুতে ২৩ বছর আগে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। তখন সাদামাটা ছিল দলের পারফরম্যান্স। প্রায় দুই যুগ পর বাংলাদেশ প্রথম দিনই দেখাল, কতটা বদলেছে তাদের ক্রিকেট। বল হাতে শুরু থেকে আগুন ঝরিয়েছেন তাসকিন আহমেদ। হাসান মাহমুদ সুইং করাচ্ছিলেন দুই দিকেই। সঠিক লেন্থে টানা বল করে যাওয়ায় মার্ক ওয়াহ বলছিলেন, ‘এটাই অস্ট্রেলিয়ান লেন্থ। ওরা সাফল্য পাবেই।’
সেই সাফল্যের দেখা মেলে ১২তম ওভারে। ডারউইনের ‘লোকাল বয়’ জ্যাক ওয়েদারাল্ড ২৩ রান করে হাসান মাহমুদের অফস্টাম্পের বাইরে থেকে হালকা আউটসুইংগারে কাভার ড্রাইভ করতে গিয়ে ক্যাচ দেন লিটন দাসকে। সেই শুরু। এরপর ৪৫ রানে শূন্য উইকেট থেকে লাঞ্চের আগে ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বসে তারা। ফিরে যান ট্রাভিস হেড (২২), মার্নাস লাবুশেন (১) ও ক্যামেরন গ্রিন (১৩)।
ইবাদতের করা ১৭তম ওভারে ২ রানে থাকা স্টিভেন স্মিথের ক্যাচ স্লিপে ছাড়েন তানজিদ হাসান। ২১তম ওভারে সেই ইবাদতের বল স্মিথের ব্যাটের পাশ দিয়ে লিটনের গ্লাভসে জমা পড়লে ‘হাঁটা’ দিয়েছিলেন স্মিথ। আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউট না দিলে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। রিপ্লেতে আলট্রাএজে কোনো ‘স্পাইক’ ধরা না পড়ায় বেঁচে যান স্মিথ। দিন শেষে স্মিথের স্বস্তি, ‘আমারও তাই মনে হয় (বল ব্যাটে লেগেছিল)। মনে হচ্ছে প্রযুক্তি বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
জীবন পাওয়া স্মিথ ১৮১ মিনিট ক্রিজে থেকে ১০৯ বলে ৭ বাউন্ডারি ১ ছক্কায় ৭১ করলে স্কোরটা ১৯৮ পর্যন্ত পৌঁছায় অস্ট্রেলিয়ার। ৫১তম ওভারে হাসানকে এগিয়ে এসে মারতে গেলে লিটনের তালুবন্দি হন তিনি। সেটা ছিল হাসানের পঞ্চম উইকেট। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে প্রতিপক্ষের মাটিতে টেস্টে সর্বোচ্চ তিনবার ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েন তিনি। এরপর নাথান লায়নকে ফিরিয়ে করেন ক্যারিয়ারের
সেরা বোলিং।
জবাবে বাংলাদেশ প্রথম দিন শেষ করেছে ১ উইকেটে ৯৬ রানে। মিচেল স্টার্কের বলে কাভার পয়েন্টে নাথান লায়নকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন সাদমান ইসলাম। তানজিদ হাসান ৩২ ও মুমিনুল হক অপরাজিত আছেন ৩৫ রানে। তবে দ্বিতীয় দিন সকালে দ্রুত তাদের ফেরানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন স্টিভেন স্মিথ, ‘বাংলাদেশের বোলাররা ভালো লেন্থে বল করেছে। দিনের শুরুতে উইকেটে আর্দ্রতা ছিল। দ্বিতীয় দিনও সেটি থাকবে। আশা করছি, শুরুতে দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফিরতে পারব।’
বাংলাদেশ কি পারবে এই চ্যালেঞ্জটা জিততে?






