অস্ট্রেলিয়ায় সেঞ্চুরির কীর্তি তানজিদের

দিনটা মনে আছে স্পষ্ট। মে মাসের এক উষ্ণ দিনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের জন্য ঘোষণা করা টেস্ট দলে নির্বাচকরা রেখেছেন তানজিদ হাসান তামিমকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির পর তাকে টেস্টেও মাঠে নামিয়ে দেওয়ার লোভটা সামলানো যাচ্ছে না, এতে করে ছেলেটার একূলও যাবে ওকূলও যাবে; এমন আলাপ তখনই শুরু হয়ে গেছে। সিলেটের মাঠে টেস্ট অভিষেকে ২৬ এবং ৪ রানের ইনিংসের পর সেই আলাপের পালে জোরালো হাওয়াও লাগল।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে পাঁচ বছর পর সৌম্য সরকারকে ফেরানোয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট মাঠে গড়ানোর আগেই ভিলেন বাংলাদেশের টপঅর্ডার। তানজিদ তামিমের ইনিংসের শুরুটা এখান থেকেই।
স্লিপে ফেলেছেন স্টিভেন স্মিথের ক্যাচ, দিনশেষে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়কের ৭১ রানের ইনিংসটাই সর্বোচ্চ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট ইনিংস খেলতে নামার আগেই তানজিদ তামিমের প্রতিপক্ষে প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড আর মিচেল স্টার্কদের সঙ্গে সমালোচনার ভয়ও যোগ দিয়েছে। ডারউইনে ব্যর্থতা মানেই পরের টেস্টে দর্শক, হয়তো টেস্ট ক্যারিয়ারেরই ইতি। আরেকটা নাঈম শেখ হয়েই কি থেকে যাবেন তামিম? উত্তরটা দিলেন ব্যাটের ভাষায়। যে ভাষাটাই সবচেয়ে জোরালো। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটা করবেন তানজিদ তামিম, এমনটা যে বা যারা ভেবেছিলেন, তাদের জ্যোতিষ চর্চায় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
তার ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিতে ৬ উইকেটে ৩৫১ রানে ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে ১৫৩ রানে।
ডারউইনে প্রথম দিনেই তামিমের ব্যাটে ছিল দৃঢ়তা, যে সংকল্পটা তার ব্যাটে অচেনা। দ্বিতীয় দিনের খেলায় সহজাত সেই সৌন্দর্য। বিউ ওয়েবস্টারকে ডাউন দ্য উইকেটে মারা ছক্কায় তামিম বোঝালেন, টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টি; বাজে বলের পরিণতি একই। তাকে টেস্ট দলে নেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, ‘তানজিদ তামিমকে নিয়ে আমরা অনেক আগ থেকেই আলোচনা করছিলাম। নতুন নির্বাচকরা তাকে দলে নিয়ে খুবই ভালো একটা কাজ করেছেন। তামিমের মতো ব্যাটার টেস্ট দলে দারুণ ইমপ্যাক্ট (প্রভাব) রাখে। তার কাছে আমার চাওয়া যেন সহজাত ব্যাটিংটাই করে। প্রথম ইনিংসে বড় রান করাটা গুরুত্বপূর্ণ।’
সিলেটে পারেননি, ডারউইনে অধিনায়কের কথা রেখেছেন তামিম। ৮ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংস খেলেছেন এই বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটার, ১৯৬৪ সালে হানিফ মোহাম্মদের পর এশিয়ার দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটিই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে করেছেন তামিম। শুধু তাই নয়, প্রায় চার বছরের বেশি সময় পর ২০২২ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাহমুদুল হাসান জয়ের সেঞ্চুরির পর দেশের বাইরে বাংলাদেশের কোনো উদ্বোধনী ব্যাটার হিসেবে করলেন টেস্ট সেঞ্চুরি।
মাইলফলক স্পর্শ করলেন নাথান লায়নের বল লং অফে ঠেলে সিঙ্গেল নিয়ে। এরপর ওয়েবস্টারের ওভার পুরোটা খেললেন, শেষ বলে নিলেন সিঙ্গেল। স্ট্রাইক নিজেই রাখলেন, পরের ওভারে আবার লায়ন। প্রথম বলে ডট, পরের বলে বোলারের হালকা আবেদন বা ব্যাটের কানায় বল না লাগাতে পারার হতাশা। তৃতীয় বলে ডাউন দ্য উইকেটে মারতে গেলেন তামিম। মারতে চেয়েছিলেন সোজা, কিন্তু লং অফে গেল বলটা। সেখানে মিচেল স্টার্ক সহজ ক্যাচটা বেশ কঠিন করে নিলেন।
কেউ কেউ হয়তো দোষ দেবেন তামিমকেই, সেঞ্চুরির পর এই শটটা কেন খেলতে গেল? একটু ধৈর্য দেখাতে পারলে ইনিংস বড় হতো। আসলে এটাই তামিম, এভাবে খেলেন বলেই তাকে দলে নেওয়া আর এভাবে খেলেই তিনি রান করেন। রিকি পন্টিং তখন দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচ হয়েছেন, ঋষভ পন্ত একটা ম্যাচে বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ দিয়ে ফেরার সময় ডাগআউটের সামনে পন্টিং তাকে বললেন, পরেরবার বলটা গ্যালারিতে পাঠাবে। তামিমও আসলে একই ধাঁচের। তাকে খেলতে দিতে হবে সহজাত খেলাটাই। তাহলেই প্রত্যাশাটা পূরণ করতে পারবেন, হোক সেটা সাদা বল কিংবা লাল।






