সাক্ষাৎকারে মার্টিন ফ্রেডরিখ
ক্রীড়া উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েও কেন পুরস্কার দিলেন না

ছবি: আগামীর সময়
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আট বছর। এ দেশের আর্চারদের মায়ায় বাঁধা পড়ে গেছেন জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। হাজার বাধা মেনেই নিভৃতে আর্চারির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন অভিজ্ঞ এ কোচ। আগামীর সময়ের সঙ্গে ফ্রেডরিখের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে অনেক প্রসঙ্গ—
প্রশ্ন : বাংলাদেশ আর্চারির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে আপনার নাম। কাজ কতটা উপভোগ করছেন?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : হ্যাঁ, আট বছর কেটে গেল। সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছে। আমার ধারণা, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা বিদেশি কোচ আমি। শুরুর দিকে এখানে একটি পেশাদার কাঠামো পেয়েছিলাম। আমাদের অনেক পেশাদার আর্চার আছে এবং বিশ্বাস করি কিছু উন্নতি করতে পেরেছি। তবে আরও অনেক কিছু করতে পারি এবং করা উচিত। আমাদের রয়েছে একটি শক্তিশালী জাতীয় দল। তবে নিচের দিকে লড়াই করার মানসিকতা এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কিছুটা অভাব বোধ করি।
প্রশ্ন : কয়েকজন রিকার্ভ আর্চার দেশ ছেড়েছেন। এ অবস্থায় রিকার্ভ দলটি কীভাবে গুছিয়ে নিচ্ছেন?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : আমরা খেলোয়াড়দের হারিয়েছি, এটা একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা। তবে আমাকে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এখন আমাদের একটা তরুণ দল আছে। যেখানে রয়েছে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়। আলিফ গত বছর জিতেছে এশিয়া কাপ, যা একটি বড় সংকেত। অন্যরাও এশিয়ার মধ্যে অবস্থান করছে সেরা দশের ভেতর। জানুয়ারিতে রিকার্ভ পুরুষ দল একটি নতুন জাতীয় রেকর্ড গড়েছে। এর মানে হলো, আমাদের নতুন প্রজন্মের রয়েছে দারুণ সম্ভাবনা। আশা করি, সামনের বিশ্বকাপগুলো থেকে শুরু করে এশিয়ান গেমস পর্যন্ত কিছু অর্জন করতে পারবে।
প্রশ্ন : কম্পাউন্ড লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, একজন ভালোমানের কম্পাউন্ড কোচের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কি?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : গত বছর আমরা একজন ভালো কোচ হারিয়েছি। তিনি জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন এবং কম্পাউন্ডে উন্নতির বড় অংশ ছিলেন। এখন আমাদের একজন খেলোয়াড় কাম কোচ আছেন, যিনি সাহায্য করছেন কম্পাউন্ড ইভেন্টে। যদি কম্পাউন্ড ইভেন্টের জন্য আমাদের আলাদা একজন কোচ থাকত, তবে কাজ হতো আরও ভালো এবং আমরা আরও বেশি এগিয়ে যেতাম।
প্রশ্ন : সারা বছর জাতীয় দল আবাসিক ক্যাম্পে থাকে। আর্চারির তৃণমূলে কতটা কাজ হচ্ছে?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাংলাদেশের আর্চারির সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে আমি খুশি নই। উদাহরণস্বরূপ— একমুখী পাইপলাইন। পাইপলাইনে আছে শুধু বিকেএসপি। তারা নিশ্চিতভাবেই ভালো কাজ করছে, তবে এটি যথেষ্ট নয় একটি দেশের আর্চারির জন্য। তাই আমাদের আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও কাজ করতে হবে, বেশি ক্লাব গড়ে তুলতে হবে, যাতে পাইপলাইনের জন্য আমাদের হাতে আরও ভালো বিকল্প থাকে। সেনাবাহিনী, আনসার, বিমানবাহিনীর মতো পেশাদার সংস্থাগুলোরও তৈরি করা উচিত নিজস্ব পাইপলাইন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশে কোচেরও অভাব রয়েছে। কোচের মানোন্নয়ন আরও ভালো হওয়া উচিত। খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে সরকার খুব ভালো কাজ করেছে, এখন দিচ্ছে স্পোর্টস কার্ড। কিন্তু কোচের জন্য কোনো কার্ড নেই; অথচ তারাই তো খেলোয়াড় গড়ে তোলেন।
প্রশ্ন : গতবার এশিয়াডে ব্রোঞ্জপদক অল্পের জন্য মিস হয়েছে। ছেলে ও মেয়েরা এবার সফল হতে পারবে কতটা?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : আমাদের লক্ষ্য থাকতে হবে পোডিয়ামে (পদক জেতা) ওঠার। কম্পাউন্ড ইভেন্টে পারফরম্যান্সের উন্নতি হয়েছে। গত বছর একটি পদক ছিল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মিক্সড টিমে। এখানেও সম্ভাবনা আছে। আসন্ন এশিয়ান গেমসে অন্তত একটি পদক আনাই মূল লক্ষ্য।
প্রশ্ন : রোমান, দিয়া, রুবেলরা দেশ ছেড়েছেন। তাদের নিশ্চয়ই মিস করেন?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : মানুষ হিসেবে অবশ্যই মিস করি। দিয়া এবং রোমানদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। তবে খেলোয়াড় হিসেবে মিস করতে পারছি না তাদের। কারণ, এটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং আমাকে তা গ্রহণ করতে হবে, সম্মান করতে হবে এবং সেই পরিস্থিতির সঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রশ্ন : যখন তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন তারা বলেছিল যে সুযোগ-সুবিধার অভাব। বেতন নিয়েও ওদের কষ্ট ছিল...
মার্টিন ফ্রেডরিখ : হতে পারে। এখন অবশ্য ভিন্ন পরিস্থিতি এবং সরকার বেতন দিচ্ছে। এটি যদি আগে ঘটত, হয়তো খেলোয়াড়রা অন্য দেশে চলে যেত না। রুবেল খুব প্রতিভাবান ছিল, ২০২৪ সালে বিশ্বকাপে দুবার শীর্ষ দশের মধ্যে ছিল। ওরা সবাই চমৎকার মানুষ, দুর্দান্ত খেলোয়াড়। তবে আমাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।
প্রশ্ন : জাতীয় দলের আর্চাররা ফেডারেশন থেকে মাসিক একটা সম্মানী পান, যা অপ্রতুল। আপনার কী মনে হয় এটা বেশি হওয়া উচিত?
মার্টিন ফ্রেডরিখ : তারা তো বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত। যেকোনো উৎস থেকে বেতন পায়। যদি তারা ভালো পারফর্ম করে, সরকারের মাসিক ভাতার পাশাপাশি ক্রীড়া কার্ডের মাধ্যমে সুযোগ পাবে। ফেডারেশন থেকে প্রতি মাসে কিছু সম্মানী দেওয়া হয়, যা আমার কাছে ঠিকই মনে হয়। তবে আরও একটি বিষয় থাকা উচিত, সেটা সাফল্যের জন্য নির্দিষ্ট কিছু অর্থ পুরস্কার। চপল (রাজীব উদ্দীন) খুবই ভালো মানুষ, তিনি কিছু অর্থ দিয়েছেন। এশিয়া কাপে সোনা জিতলে, বিশ্বকাপে সেরা আটের মধ্যে থাকলে বা অন্যান্য অর্জনে বোনাসজাতীয় কিছু থাকলে ভালো হয়।
প্রশ্ন : ফেডারেশন তো বোনাস দেয় নিয়মিতই…
মার্টিন ফ্রেডরিখ : তাদের সামর্থ্যের মধ্যে যতটা সম্ভব দেয়। আমার একটা খারাপ লাগার বিষয় আছে। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা (আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া) কেন ঘোষণা দিয়েও আর্চারদের পুরস্কার দিলেন না? গত বছর নভেম্বরে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে কম্পাউন্ড মিশ্র দ্বৈততে হিমু ও বন্যা জিতেছিল রুপা। কম্পাউন্ড এককে ব্রোঞ্জ জিতেছিল কুলসুম। তাদের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকা করে বোনাস দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন উপদেষ্টা। সেই বোনাস আজও আর্চারদের হাতে পৌঁছায়নি। খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে যাচ্ছে এটি। ক্রীড়া উপদেষ্টার ঘোষণা দিয়েও পুরস্কার না দেওয়া উচিত হয়নি। এতে ছেলেমেয়েদের মধ্যে চলে আসতে পারে হতাশা।




