আধুনিকতার প্রস্থান ও ডানপন্থার উত্থানের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতন

বিশ্ব জুড়ে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, মেরূকরণ, ডিজিটাল টেকনো-রিলিজিয়াস ডিস্টোপিয়া ধর্মীয়-জাতিগত উগ্রতার উত্থান, সেসবের ভবিষ্যৎ কী? এই টেকনো-ফিউডাল সময়ে যেসব লক্ষণ অার ক্ষতচিহ্ন তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে শতাব্দীর মাঝামাঝি সবকিছু ভেঙে পড়ার মতো একটা চরম দুঃসময় আসতে যাচ্ছে
আমেরিকান রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকোইয়ামা তার বিতর্কিত বই The End of History and the Last Man (১৯৯২)-এ ‘ইতিহাসের শেষ’ঘোষণা করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পরাজয় আর নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নে সাম্যবাদের পতনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা উদারনৈতিক পুঁজিবাদ মানবসভ্যতার চূড়ান্ত বিজয়ী মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ, মানব ইতিহাস আর কোনো মৌলিক মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের দিকে এগোবে না; বরং এ ব্যবস্থার ভেতর দিয়েই মানুষের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে। কিন্তু ইতিহাস বড় পরিহাসপ্রিয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও নানাবিধ নগ্ন সব ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় ইতিহাসবিদরা এ মুহূর্তে খোদ উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থারই শেষ দেখতে পাচ্ছেন। আশঙ্কা করছেন, বিশ্ব জুড়ে উগ্র ডানপন্থী ফ্যাসিস্ট শক্তির পুনরুত্থানের। দক্ষিণ এশিয়াসহ বাংলাদেশও এ প্রবণতার বাইরে নয়। পশ্চিমা এনলাইটেনমেন্ট, আধুনিকতা এবং তার সূত্র ধরে গড়ে ওঠা উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বহুদিন ধরেই বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় এ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং এসব প্রশ্নের ন্যায্যতাও আছে। কিন্তু বিষয় হলো, এ সমালোচনাগুলো আবার উল্টোভাবে উগ্র ডানপন্থীরা ব্যবহার করছে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে।
ক্ল্যাসিকাল মার্ক্সিস্ট ও পশ্চিমা লিবারেল চিন্তার বাইরে এসে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে উত্তর আধুনিক তত্ত্ব, কন্টিনেন্টাল ফিলসফি, পোস্ট কলোনিয়াল তত্ত্ব, এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত সাবঅল্টার্ন চিন্তার চর্চার শুরু হয় নব্বই দশকের শুরুতে
স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভয় জিজেক একটা কথা বলেন, ‘ফ্যান্টাসি যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন তা প্রায়ই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় ‘উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার পতনের যে রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে চালু ছিল, সেটিই কি আজ দুঃস্বপ্নের আকারে ফিরে আসছে? বিশ্ব জুড়ে ধেয়ে আসছে যুদ্ধ, মেরূকরণ, ডিজিটাল টেকনো-রিলিজিয়াস ডিস্টোপিয়া? ধর্মীয়-জাতিগত উগ্রতার উত্থান? এটাই কি আসন্ন ভবিষ্যৎ? আমরা জানি না। তবে এই টেকনো ফিউডাল সময়ে যে সব লক্ষণ আর ক্ষতচিহ্ন তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে, তাতে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সব কিছু ভেঙে পড়ার মতো পৃথিবীব্যাপী একটা চরম দুঃসময় নেমে আসতে পারে।
২০১৭ সালে ‘ভারতীয় চৈতন্যের বিউপনিবেশায়ন’শীর্ষক সম্মেলনে সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গের ইতিহাস প্রকল্পের তাত্ত্বিক দীপেশ চক্রবর্তীর ব্যাপক প্রশংসা করেন ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদ এবং আরএসএস সমর্থক রাকেশ সিনহা। ভারতীয় বিচার মঞ্চ নামের একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন আয়োজিত এ সম্মেলনের বিষয় কেবল ভারতীয় চৈতন্যের মামুলি বিউপনিবেশায়ন ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল, ভারতীয় মানসকাঠামো থেকে অন্য সব পরিচয়ের চিহ্ন মুছে ফেলে কেবল হিন্দু আত্মপরিচয়ের গেরুয়া ঝান্ডাকে তুলে ধরা। সম্মেলনে রাকেশ বলেন, Provincializing Europe-এর মাধ্যমে ইউরোপকে চিন্তার জগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নিছক প্রান্তিক ঘোষণা করার সাহস দেখিয়েছেন দীপেশ। তিনি বলেন, যে কাজ হিন্দুত্ববাদীদের করার কথা, তা অনেকাংশে উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদরাই করে দিয়েছেন। রাকেশের এই পোস্ট কলোনিয়াল প্রশংসা বিস্ময়-জাগানিয়া হলেও, গভীরে গেলে একটি ছেদবিন্দু স্পষ্ট হয়। উত্তর ঔপনিবেশিক ও সাবঅল্টার্ন চিন্তা পশ্চিমা আধুনিকতার সর্বজনীনতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আর এই জায়গাটিকেই কাজে লাগায় উগ্র ডানপন্থা। গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সেক্যুলারিজম, নারীবাদের মতো বিষয়গুলোকে অস্বীকার করে ‘পশ্চিমা চাপিয়ে দেওয়া’ মূল্যবোধ হিসেবে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালেও আমরা কাছাকাছি বিষয় দেখতে পাব। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্বিন্যাস হয়েছে। এখানকার তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে, যাদের একাংশ ইসলামপন্থী, পশ্চিমা নানা তত্ত্ব ও দর্শনচর্চা খুবই জনপ্রিয়। বিশেষ করে যেগুলো পশ্চিমা আধুনিকতা হতে প্রস্থান কামনা করে, কিংবা পশ্চিমা ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতার’ (epistemic violence) প্রবল সমালোচক এবং সবকিছুকে কেবল ক্ষমতা সম্পর্কের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করে। এ ধরনের তত্ত্বচিন্তা ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ভাষা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পরিচয় ইত্যাদি বিষয়ে নানা বয়ান তারা হাজির করছেন। মোটাদাগে দেখা যাবে এ ধারার চিন্তার আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বামপন্থা এবং সেক্যুলার-লিবারেল ঘরানা। আর এ চিন্তা সবচেয়ে বেশি যাদের পক্ষে যাচ্ছে তারা হচ্ছে ইসলামপন্থী অংশটি, যাদের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিপ্রায় আছে।
যদিও এ লেখার ক্ষুদ্র পরিসরে খুব বেশি ডিটেইলে যাওয়ার সুযোগ নেই, তারপরও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিকবলয়ে কীভাবে এ বিষয়টি বিস্তারিত হয়েছে, তার একটু খতিয়ান দেওয়া যেতে পারে। ক্ল্যাসিকাল মার্ক্সিস্ট ও পশ্চিমা লিবারেল চিন্তার বাইরে এসে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে উত্তর আধুনিক তত্ত্ব, কন্টিনেন্টাল ফিলসফি, পোস্ট কলোনিয়াল তত্ত্ব, এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত সাবঅল্টার্ন চিন্তার চর্চার শুরু হয় নব্বই দশকের শুরুতে। যেখানে একটা কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ধর্ম প্রশ্ন, আরও বিশেষভাবে বললে ইসলাম প্রশ্নকে মোকাবিলা করা। যেখানে ধর্ম নিছক সুপারস্ট্রাকচারের বিষয় নয়; বরং নিম্নবর্গের রাজনৈতিক অভিব্যক্তির অস্তিগত কেন্দ্র। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মকে আশ্রয় করে যেকোনো রাজনৈতিক তৎপরতাকেই একটা দুর্নীতিগ্রস্ত এলিট শ্রেণির বিরুদ্ধে, রাষ্ট্র নামক একটা শোষণযন্ত্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িত নিম্নবর্গের ইমানি রাজনৈতিক প্রতিরোধের নিশান হিসেবে পাঠ করা হয়। এই বয়ানে এ অঞ্চলের নিপীড়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবর্গ মানুষের ধর্মপরিচয়ই মুখ্য। এ পরিচয় হলো বাঙালি মুসলমান, যারা মূলত চাষাভুষা, যুগ যুগ ধরে হিন্দু জমিদারদের দ্বারা নিপীড়িত, বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা তাদের ওপর কলকাতা থেকে ধার করা সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছে, মূলধারার যে ভাষা ও সংস্কৃতি, সেখানে এই বাঙালি মুসলমানদের ন্যায্য হিস্যা দেওয়া হয়নি। এই বয়ানেরই ধারাবাহিকতা হলো একটা ‘ইসলামি’ আত্ম এবং বামপন্থী, বাঙালি জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলার, লিবারেল গোষ্ঠীকে একদাগে ‘শাহবাগ‘ অপর হিসেবে চিহ্নিত করা। যেখানে শাহবাগী মানে হলো, সে ‘ভারতীয় দালাল, নাস্তিক, ইসলামবিদ্বেষী‘ ইত্যাদি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে এই বয়ান খুবই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ সময়ে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মব আক্রমণকে ন্যায্যতা দিতে এ ধরনের বয়ানকে ব্যবহার করা হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত Postcolonial Theory and the Making of Hindu Nationalism : The Wages of Unreason বইয়ে ভারতীয় লেখক মীরা নন্দা উত্তর ঔপনিবেশিক, সাবঅল্টার্ন চিন্তকদের মতো আধুনিকতাবিরোধীদের সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে উদ্ভূত ‘রক্ষণশীল বিপ্লব‘ চিন্তকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন: অসওয়াল্ড স্পেংগলার, আর্থার মোয়েলার, আর্নস্ট ইয়ুঙ্গার, কার্ল স্মিট ইত্যাদি। এই চিন্তকরাও একইভাবে আধুনিকতার বিরোধিতার নামে তৎকালীন ভাইমার রিপাবলিকের গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক মূল্যবোধের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলেন। যদিও এই চিন্তকদের বেশিরভাগই নাৎসিবাদের সমালোচক ছিলেন, তবু তাদের চিন্তা হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি উত্থানের পথ মসৃণ করে দিয়েছিল, যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা জানি।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




