প্রেমে-অপ্রেমে শিবরাম চক্রবর্তী

শিবরাম চক্রবর্তী
শিবরাম চক্রবর্তীর সাহিত্য সম্পর্কে যাদের অল্প-বিস্তর ধারণা আছে, তারা নিশ্চিতভাবে জানেন, ফেলে-ছড়িয়ে যাপন করা এক জীবনের মধ্যে প্রেমের মৌমাছির যাতায়াত ছিল অবাধে। কিন্তু তাদের গল্পের শেষটা কোনো মীমাংসা ছাড়াই শেষ হয়েছে, আর পরিবর্তে লেখা হয়েছে অনেক গল্প, যার মূল বিষয় নারী এবং প্রেম। গল্প উপন্যাসের সীমানা টপকে আত্মস্মৃতি ‘ঈশ্বর-পৃথিবী-ভালোবাসা ও ভালোবাসা-ঈশ্বর-পৃথিবী’ বই দুটিতেও সেই প্রেম অথবা ভালোবাসা কল্পনা আর বাস্তবে মিলেমিশে আরেক গল্প তৈরি করেছে। প্রথম কৈশোরের প্রেমিকা রিনি, প্রথম যৌবনের সঙ্গিনী নানু বা লালির উপস্থিতির আভাস তার প্রেম-অপ্রেমের অন্য এক ছবিকে স্পষ্ট করে তোলে। অথচ কোনো কাহিনির বিবরণে তিনি সেই নিজেকেই অনুপস্থিত করে রেখেছেন।
আজ বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য লেখকের মৃত্যুর ৪৬ বছর পর তার প্রেমের মধ্যেও সেই হাস্যরসাত্মক গল্প অথবা জীবনের অন্যমনস্ক প্রান্তরের গল্পের ভেতরে ভলোবাসায় জড়িয়ে থাকা অন্য এক সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তীকে আরেক মাত্রায় পাঠকের সামনে তুলে ধরবে বলেই মনে হয়। শিবরাম চক্রবর্তী ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন কলকাতায়।
শিবরাম চক্রবর্তীর বাস্তব জীবনের প্রেমের গল্পের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতার পঙক্তির মিল খুঁজে পাওয়া যায়— ‘ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া’। সেই কৈশোরের রিনি নয়, বাস্তবে রিনির ছোট বোনের সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীর বিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন রিনির মা। অন্যদিকে কলকাতা শহরেরই লালি নিজেই তাকে বিয়ে করার জন্য উন্মুখ ছিল। কিন্তু শিবপ্রসাদ চক্রবর্তীর বড় ছেলে ‘আধা-গৃহী, আধা-সন্ন্যাসী শিবরামের পক্ষে কোনো ক্ষেত্রেই এগোনোর বা সায় দিয়ে ফেলার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াও সম্ভব হয়নি। আর তাতে ঢাকাই শাড়ি পরে কেউ-ই আসেনি তার স্থায়ী নিবাস কলকাতা শহরের ১৩৪ নম্বর মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেস বাড়িতে। ফলে বাকি জীবন বিস্তর হাসির ফোয়ারা ছোটানো লেখালেখির মধ্যে তিনি রচনা করেছেন প্রেমের সিরিও-কমিক ধরনের গল্প।
শিবরাম চক্রবর্তীর ‘অথ বিবাহ ঘটিত’, ‘ঘরণীর বিকল্প’ ‘পাত্র-পাত্রী সংবাদ’, ‘প্রেমের কথামালা’, ‘প্রেমের বি-চিত্র গতি’ অথবা ‘বিয়ে প্রুফ বউ’ ইত্যাদি গল্পগ্রন্থে অথবা আরও কিছু গল্প, উপন্যাস আর কবিতায় নারী এবং প্রেমের প্রসঙ্গ উঁকি দিয়েছে। যে প্রেক্ষাপটকে শিবরাম নিজে বলতেন, ‘নারী দুর্ঘটিত।’
তার প্রথম কবিতার বই ‘চুম্বন’ প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রায় ৪০ বছরের লেখকজীবনে সাবালক বাঙালি পাঠকদের কাছে যিনি প্রেম নিয়ে নানা ক্যারিকেচার গল্প সাজিয়ে গেলেন, তিনি মূলত প্রচার ও প্রসার পেলেন ছোটদের বড় লেখক হিসেবে। শিবরাম চক্রবর্তী প্রেম-বিয়ে-সংসার নিয়ে প্রায় ৩০টি বই প্রকাশ করেছেন।
নিজের লেখা কাহিনিতে নিজেকে আড়াল করে তিনি প্রেমের গল্পের মূল দর্শন ব্যাখ্যা করে গেছেন আত্মজীবনীতে: ‘সত্য কথা বলতে কী, আমার দাম্পত্য-যোগে রোমান্সের র-ও ছিল না। আর র-মেটিরিয়াল বাদ গেলে ওর আর থাকে কী? যা থাকে তা নিতান্তই মেয়েলি, মামুলি ব্যাপার। একেবারেই ওম্যানস! তাই, আমার বিয়ে করাটাকে অ্যাডভেঞ্চার বলেই বলেই আমি আখ্যাত করব! হ্যাঁ, দস্তরমতো এক অ্যাডভেঞ্চার— তা ছাড়া আর কী?’
জীবনে সংসার পাতেননি। মেসের একটা ঘরেই কেটেছে তার জীবন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন, আবার পেট চালাতে রাস্তায় পত্রিকাও বিক্রি করেছেন। মেসের যে ঘরে থাকতেন, সেখানে দরজায় কোনোদিন তালা দিতেন না। তালা দিয়ে লাভ কী? চুরি হওয়ার মতো কিছুই ছিল না তার ঘরে। শুধু ঘরের চার দেয়াল জুড়ে লেখা ছিল অজস্র নাম-ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর। শিবরামের অকাট্য যুক্তি, ‘খাতা হারিয়ে গেলেও দেয়াল হারিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
মৃত্যুর আগে হঠাৎ কয়েক দিনের প্রবল জ্বরে ভুগে বাথরুমে ঢুকে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। সারা রাত বাথরুমে পড়ে থাকার পর ভোরে মেসের অন্য বোর্ডাররা হাসপাতালে ভর্তি করায়। ১৯৮০ সালের ২৮ অাগস্ট সকাল। হাসপাতালের বেডে আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে আছেন। চিকিৎসক এসে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এখন কেমন লাগছে?’ উত্তরে জড়ানো গলায় বলেছিলেন, ‘ফার্স্টক্লাস।’ আর উত্তরের পাঁচ মিনিট পরেই তিনি চোখ বন্ধ করেছিলেন মহাকালের যাত্রাপথে।








