ত্রিমাত্রিক
মাঝরাস্তায় কয়েক যুবক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সোনালু ফুলগাছের সারি দেখতে দেখতে হঠাৎ থেমে যাই আমরা। সংসদ ভবনের পুব পাশটা দেখে নিই একপলক। এগিয়ে যাই দক্ষিণে, মানিক মিয়া ছুঁয়ে যাব ডান পাশে। ঠিক মাঝখানে দাঁড়াব আমরা, মোট পাঁচজন; তিন তরুণ, দুই তরুণী।
কিছু মানুষ দেখব আজ আমরা।
সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে দেখার চেয়ে তার পিস্তলটা দেখার খুব শখ আমাদের। জিবরাইলের ডানা নামে একটি গল্প আছে কথাসাহিত্যিক শাহেদ আলীর, সানাউল্লার মহাবিপদ নামে একটা উপন্যাস আছে হুমায়ূন আহমেদের, সুনীলের একটি কবিতা আছে নীরার অসুখ। ইশরাককে দেখার পর আমরা তাকে একটা প্রস্তাব দেব, ‘একটা নাটক লিখুন ইশরাক ভাই। নাটকের নাম হবে, ইশরাকের পিস্তল।’
কিন্তু না, ইশরাকের বাসার দিকে যাওয়া হলো না আমাদের।
দুই
পুকুরে ঢিল তো আমরা সবাই মারতাম। ওই যে, মাটির ভাঙা পাত্রের চাড়া ছুড়তাম পানিতে, ব্যাঙের মতো কিছুটা লাফানোর ভঙ্গিতে সেটি চলে যেত দূরে, ওপাশে। ছোটকালের কথা, পুকুরের পাশে থাকা সবাই করতাম একসঙ্গে।
আবার ধরা যাক, পরিষ্কার রাস্তার কোথাও কেউ ময়লা ফেলল, কয়েক দিন পর দেখা যাবে ময়লার স্তূপ হয়ে গেছে সেখানে, অন্যরাও ফেলছে। রাস্তার কোনো স্থানে জলত্যাগ বা মূত্র বিসর্জনেও এমন হয়, শুরু করলেই নিয়মিত হয়ে যায় সবই।
এটাকে বলে, দেখে করা বা দেখে শেখা। অনেকটা হাতে-কলমে শেখার বিষয়ের মতো।
রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীর ব্যাপারটাও অনেকটা এরকম। বিমানবন্দরে বিদায় নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তাদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে হাত মেলান ইউসুফ আলীও। এরপর তিনি প্রটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রীর দিকে ঝুঁকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় স্ট্যান্ডরিলিজ করা হয় তাকে।
ইউসুফ আলী সাহেবের হাত মেলানোর ব্যাপারটা খুব সাধারণ। ধরা যাক, সামনে কোনো নির্বাচন, ভোটপ্রার্থী একজন, ইউসুফ সাহেব ভোটার। তখন কিন্তু প্রার্থী আর ভোটারের মধ্যে কোনো ফারাক নেই; হাত মেলায়, বুকে বুক মেলায়, কোলাকুলি করে জড়িয়ে। প্রার্থী জিতে গেলে, কোনো পদ পেলেই, প্রটোকলের ছুতোয় বিভাজন সৃষ্টি হয়!
কিন্তু কেন?
এটা জাস্ট একটা ভাবনা।
আর ওই ঝুঁকে যাওয়ার ব্যাপারটা? ওটা একটা আবেগ, সম্মান। আবেগ আর সম্মান নিয়েই তো মানুষ। ইউসুফ ভাই, লাভ কিন্তু আপনারই হয়েছে— কোটি টাকা খরচ করেও এত মানুষের কাছে নিজেকে পৌঁছাতে পারতেন না আপনি, পরিচিত হতে পারতেন না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভাইরাল সবাই হতে চায়, কেউ কেউ হঠাৎ হয়ে যায়, আপনিও তাই। অভিনন্দন আপনাকে।
তিন
কিশোরগঞ্জ ভৈরবের ওসি মাহবুবুর রহমানকে লম্বা একটা সালাম আমরা দিতেই পারি। দোকানপাট ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনায় প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি।
পুলিশ সাধারণত কীভাবে ঘুষ নেয়?
ক. ঘুষদাতা তার হাতের মুঠোয় রাখা টাকা চুপিচুপি ঢুকিয়ে দেয় পুলিশের হাতের মুঠোয়।
খ. পুলিশ তার অফিসের ড্রয়ার আলতো ফাঁক করে রাখে, আসামিপক্ষের লোক তাতে টুক করে ফেলে দেয় টাকার বান্ডিল।
গ. অনেক থানায় বড় পুলিশ অফিসারের কোনো এজেন্ট থাকে ছোট পুলিশ অফিসার। এই ছোটজন অর্থের বিভিন্ন বিষয় ম্যানেজ করে বড়জনের পক্ষ থেকে।
ঘ. বাসায় বিভিন্ন ফল-মিষ্টি-বড় মাছ পাওয়ার পাশাপাশি টাকার প্যাকেটও পেয়ে থাকেন অনেক পুলিশ সাহেব।
ঙ. ব্যাংেকর অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায় যথাসময়ে, কিন্তু সেই অ্যাকাউন্ট আবার পুলিশ সাহেবের নিজের নয়। বউয়ের, শ্যালিকার কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির।
কিন্তু ওসি মাহবুবুর রহমান ঘুষ নিয়েছেন বিকাশে। বিকাশে এর আগেও অনেকে নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু জনসমক্ষে এবং প্রকাশ্যে এলো মাহবুবুর রহমানেরটা। ফলে আমরা তাকে এ পদ্ধতির পাইওনিয়ার কিংবা পথপ্রদর্শক বলতে পারি। বিকাশ কর্তৃপক্ষও তাকে দিয়ে একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করতে পারে এ সুযোগে। মাহবুবুর রহমানের হাতে অনেক টাকার বান্ডিল। পাশে লম্বা একটা লাইন—
আমি এখন ঘুষ নিই বিকাশে।
আপনি?
চার
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পৌঁছানোর আগেই দুপুর হয়ে গেল। কিছুটা সংকোচ বোধ করতে লাগলাম আমরা— ভরদুপুরে কারও বাসায় কিংবা অফিসে যাওয়া ঠিক নয়, অশোভন। আমাদেরও তাই বলা হয় না— স্যার, সমাজের নিকৃষ্ট লোকটা এমপি-মন্ত্রী হয়, সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ হয় নেতা, আপনি বলেছেন।
এবার আপনার কাছে তিনটি প্রশ্ন—
ক. নিকৃষ্ট ও দুর্নীতিবাজরা দেশের কতটুকু উন্নতি করতে পারবে?
খ. নিকৃষ্ট ও দুর্নীতিবাজদের কেউ সম্মান করে না। আমরা কেন তাহলে তাদের সম্মান দিই, অভিভাবক বানাই আমাদের?
গ. দূর্বাঘাসের মতো আমরা কি তাদের উপড়ে ফেলতে পারি এখনই?
পাঁচ
প্রশস্ত নদীর মতো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। পুজোর ছুটিতে অনেকটা ফাঁকা রাস্তাঘাট। আমরা একেবারে রাস্তার মাঝে এসে দাঁড়াই। প্রযুক্তি নেই, সংরক্ষণের ভালো ব্যবস্থা নেই, পরিবহনের চরম অব্যবস্থাপনায় আমাদের ঘাম ঝরানো কৃষকের ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ফসল পচে-গলে নষ্ট হয় প্রতি বছর!
মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো খবর।
কিন্তু যাদের মাথা ঘোরানোর কথা, তাদের ঘোরায় কি?
প্রচণ্ড রোদ আর ভ্যাপসা গরমে আমাদের ঘোরাচ্ছে। সড়কে মৃত্যুতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয়। আরও একটু উদাসীন আর দায়িত্বহীন হলেই প্রথম হতে পারব অচিরেই। ভেঙে যায় যায় অবস্থার একটা রঙহীন বাস আসছে দ্রুত, এদিকে। হঠাৎ মাথায় এলো— এই পাঁচজনের মৃত্যুতে কি প্রথম হতে পারব এই মুহূর্তে? অবদান রাখতে পারব দুর্নীতিতে প্রথম হওয়ার মতো সড়ক মৃত্যুতেও?
ভাবছি আমরা, এগিয়ে আসছে বাসও।



