ত্রিমাত্রিক
বাজারে একদিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চোখ দুটো বারবার মানুষটির দিকে যাচ্ছিল। কালো রঙের একটা লাঠি তার হাতে। দুমুঠোয় ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। একটা ব্যাগও ঝুলছে মুঠো থেকে, প্রচলিত একটি বাজারের ব্যাগ। চিৎকারটা এলো ডান দিক থেকে। মাথার ঘোমটা আরও একটু টেনে মহিলা আগের স্বরেই বললেন, ‘মগের মুল্লুক পেয়েছেন নাকি? আদার দাম দুদিনেই চল্লিশ টাকা বেড়ে গেল!’
সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা সাহেবের বাসা-লাগোয়া বাজার। ঢুকতেই গ্রিলঘেরা দুটো কবর। তার বাইরে, সামনে, বেদির মতো উঁচু জায়গাটায় মিজানের ফলের দোকান। সবসময় মাথায় টুপি পরিহিত মিজান বিষাদ গলায় বলল, ‘ছার, আর ব্যবসা করতে ইচ্ছে করে না। জিনিসপত্রের যা দাম, নিজেদেরই কিনতে শরম লাগে। বিক্রি করমু কী!’ মহিলার ফুটছয়েক দূরে দাঁড়াই আমি। চোখে চশমা, চিকন পাড়ের একটা শাড়ি পরনে, দুহাতে সোনালি রঙের দুটো চুড়ি। এ বাজারের সবচেয়ে ভদ্র আর অপেক্ষাকৃত কিছু কম দামে সবজি বিক্রি করা জয়নালের দিকে তাকাই আমি। দ্রুত সবজি মাপছে সে। চাহিদামতো খরিদ্দারদের দিচ্ছে সে। একটু ফুরসত পেয়েই মহিলার দিকে তাকাল, ‘ম্যাডাম, বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। আমরা কিনে আনি বেশি দামে, বিক্রি করতে হয় তাই বেশি দামে।’ ‘বাজারে হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ কী?’ ‘আমি জানি না, ম্যাডাম।’ শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছলেন মহিলা। দুপাশে তাকালেন একবার। সারি বাঁধা সবজির দোকান। বাম পাশের দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।
দুই
লাঠি ভর করে দাঁড়ানো ব্যাগ হাতে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এক পলক তাকালেন তিনি আমার দিকে। খুক করে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম তার। আকর্ষিত হলেন না মোটেই। আরও একটু কাছে ঘেঁষলাম তার। আগের মতোই তিনি অনড়। ‘অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি এখানে।’ একটু থেমে বলি, ‘কিছু দেখছেন?’ ‘না, না।’ ম্লান হাসলেন তিনি, ‘হিসাব মেলাচ্ছি।’ ‘মিলছে?’
উত্তর দিলেন না প্রশ্নের, মৌনতায় না মেলানোর আভাস। ‘নিশ্চয়ই বাজার করতে এসেছেন?’ ‘জি। কিন্তু কোন জিনিস দিয়ে শুরু করব, বুঝতে পারছি না। প্রতিদিনের যোগ-বিয়োগে জট লেগে গেছে মাথায়। গুনে গুনে জীবন চলে না; কিন্তু গুনে গুনে খাবার কিনতে হয় এখন। অথচ—।’ কথা শেষ করলেন না মানুষটি। মনোযোগ দিয়ে যা দেখছিলেন, আরও মনোযোগ দিলেন তাতে। হঠাৎ একটু ঘুরে দাঁড়ালেন আমার দিকে, ‘ওই যে বৃদ্ধাকে দেখছেন, একটু ভালো করে দেখুন তাকে।’ মুরগি বিক্রির খাঁচাগুলোর দিকে তাকালাম। কিনছেন কেউ কেউ। জবাই করে পুরো শরীরের চামড়া ছিলছেন বিক্রেতা। ফেলে দেওয়ার আগেই হাত পাতছেন বৃদ্ধা। অবহেলায় বিক্রেতা হাতে দিচ্ছেন তার। পলিথিনের একটা ব্যাগে যত্ন করে পুরছেন তিনি; মুখে হাসি, পুরো অবয়বে আনন্দ।
তিন
শীতের আগমনী বার্তা। বেশ কয়েক পদের শাক এসেছে বাজারে। ক্রেতা কম। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করতেই মৃদু হাসল সে, ‘শাকের দাম বাড়তি। সবাই জিগায়, কিন্তু কেনে না।’ কোনার ফল বিক্রেতার দোকানে চিৎকার করে উঠল কে যেন। এগিয়ে গেলাম। ভিড় জমে উঠেছে সেখানে। স্বাস্থ্যবান এক যুবক গলা ফাটিয়ে বললেন, ‘ওই... বাচ্চা, পাকা পেঁপে কিনলাম কাল তোর কাছ থেকে। পেঁপে খাওয়া যায় না। ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। কারণ কী?’ মারতে উদ্যত হলো যুবকটি। পাশ থেকে মাঝবয়সী এক মহিলা বললেন, ‘একেকটা ফল পাকাতে যে পরিমাণ বিষ মেশায়, মুখে দেওয়া যায় না। কেউ দেখার নেই।’ হঠাৎ মনে একটা প্রশ্ন জাগল— আমরা প্রতিদিন কতটুকু বিষ খাই? আমাদের চালে-ডালে বিষ, ফলে বিষ, মাছ-মাংসে বিষ, শাকসবজিতে বিষ, দুধ-ডিমে বিষ! আমরা এসব খেয়েও বেঁচে আছি; কিন্তু বেঁচে নেই আমাদের বোধ, বিবেক, মানবিকতা, মনুষ্যত্ব!
চার
ফোন বাজছে পকেটে, অনেকক্ষণ। বের করলাম, রিসিভ করলাম। পুজোর ছুটির ফুরফুরে গলায় বউ বলল, ‘বাজারে গিয়ে হারিয়ে গেলে নাকি!’ ‘না দেহ হারাইনি, তবে মন হারিয়ে ফেলেছি।’ ‘মানে কী?’ ‘মানে জানি না।’ ‘তুমি সচরাচর বাজারে যাও না। খরচ বেশি খরচ বেশি করে চিল্লাও। আজ ইচ্ছে করে বাজারে পাঠিয়েছি। তা, কিছু বুঝতে পারছ?’ ‘জি।’ ‘কী বুঝতে পারছ?’ ‘কুচো চিংড়ি দিয়ে কচুর শাক অনেক মজার। ভাবছি— আগে শাক কিনব না চিংড়ি কিনব। দুটো একসঙ্গে কিনতে পারব কি? অত টাকা কি আছে আমার মানিব্যাগে!



