যে কাস্ত্রো বদলে দিয়েছিলেন কিউবার ইতিহাস

ফিদেল কাস্ত্রো- রয়টার্স
জানুয়ারি ১৯৫৯, রাজধানী হাভানায় ঢুকে পড়ছে বিপ্লবীরা। রাস্তায় শত শত কিউবান জড়ো হয়েছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে শত শত জিপগাড়ি, ট্রাক আর ট্যাঙ্ক। একটি ট্যাঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে ফিদেল কাস্ত্রো, পাশে তার সহযোদ্ধা বিপ্লবী কমান্ডাররা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে কাস্ত্রো ও বিপ্লবীদের। জনতা স্লোগান দিচ্ছে, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। কিউবায় অবসান ঘটে মার্কিন অনুগত ফুলহেনসিও বাতিস্তা সরকারের। দশকব্যাপী কিউবা শাসন করেছিলেন বাতিস্তা।
কিউবার পাশেই ফ্লোরিডা প্রণালি। ওপারেই যুক্তরাষ্ট্র। তাবেদার বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটলে চিড় ধরে কিউবা-মার্কিন সম্পর্কে। বাতিস্তা ছিলেন সামরিক জেনারেল। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ১৯৫২ সালে। কিউবার কথিত এলিটদের প্রিয়পাত্র ছিলেন বাতিস্তা। আন্দোলনরত শ্রমিক-কৃষকদের ওপর বাতিস্তার নির্যাতন ছিল ভয়াবহ। আন্দোলন করতে গিয়ে কাস্ত্রোও জেল খাটেন। তারপর চলে যান নির্বাসনে। ১৯৫৬ সালে শেষ দিকে গোপনে ফিরে আসেন কিউবার পূর্বাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা সিয়েস্ত্রায়। এখানে ঘাঁটি স্থাপন করেন, সঙ্গে ভাই রাউল কাস্ত্রো, আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া আর্নেস্তো চে গুয়েভারা আর অল্প কিছু বিপ্লবী।
এখান থেকেই বাতিস্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। অবিরাম যুদ্ধের ভেতর দিয়ে সাফল্য পেতে থাকেন। ১৯৫৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর গভীর রাতে ফুলহেনসিও বাতিস্তা কিউবা ছেড়ে পালিয়ে যান। আশ্রয় নেন ডোমিনেক্যান রিপাবলিকে।
বাতিস্তার পালানোর খবর জানতে পেরে মানুষ উল্লাস আর অরাজকতা শুরু করে। বিপ্লবীরা হাভানায় ঢুকেই সামরিক শাসন জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। হাভানার সামরিক স্থাপনাগুলো সহজেই বিদ্রোহীযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। একটি গুলিও খরচ করতে হয়নি বিপ্লবীদের। সরকারি সেনারা আত্মসমর্পণ করেন। ৮ জানুয়াারি ফিদেল কাস্ত্রো হাভানায় আসেন। তিনি দ্রুত রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণে নেন।
ফিদেল কাস্ত্রো কিউবাকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। উন্নত দেশগুলোর সমতুল্য কিউবার শিক্ষা হার আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলেন কাস্ত্রো, যা অনেক দেশের কাছেই ঈর্ষণীয়। কিউবানদের গড় আয়ু আর শিশুমৃত্যুর অতি নিম্নহারও ইউরোপের যেকেনো দেশের সঙ্গে তুলনীয়।
বিশ্বের নানা দেশে বিপ্লব থেকে কিউবার বিপ্লব কৌশল ছিলো ভিন্ন, ভিন্নতা ছিল দেশ গঠনের কৌশলেও। বিপ্লবের পর কিউবায় প্রতিবিপ্লবীদের নির্মূলের নামে হত্যা করা বা কোনো শ্রমশিবিরও খোলা হয়নি।
তারপরও কাস্ত্রোকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, অব্যাহত মার্কিন ষড়যন্ত্র আর আক্রমণ। ১৯৬১ সালে মার্কিন সমর্থিত বে অব পিগস অভিযানকে পরাজিত করা ছিল কাস্ত্রোর আরেক বড় সাফল্য, যা কিউবার বিপ্লবকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কিউবার ক্ষমতায় আসেন ফিদেল কাস্ত্রো। প্রায় পাঁচ দশক কিউবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে পার করেছেন ১০ জন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের শাসনকাল। সেই সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন ৬৩৮ টি হত্যাপ্রচেষ্টা।
২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর পরোপারে চলে যান, ১৩ আগস্ট ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো। তার জন্মদিনে লাল সালাম।
লেখক: ডিরেক্টর (এডমিন), আগামীর সময়







