চাঁদের বুড়ির গল্পের ঝুড়ি নিয়ে পৃথিবীর পথে আর্টেমিসের চার নভোচারী

এবার কি চাঁদের নতুন গল্প শুনবে পৃথিবী? উপগ্রহটির অদেখা পাশের অজানা তথ্য নিয়ে পৃথিবীমুখী আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী। তাদের বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযানটির শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের কথা।
মহাকাশ থেকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে শেষ দফার আলাপে চমক দিয়েছেন মহাকাশচারীরা। তারা শুধু ছবি বা ভিডিও নয় সঙ্গে আনবেন চাঁদ সম্পর্কে বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্যও।
‘আপনারা এখন পর্যন্ত অনেক কিছু দেখেছেন। কিন্তু আসল জিনিসগুলো আমাদের সঙ্গে ফিরছে। আরও অনেক ছবি আছে, অনেক গল্প আছে।’ চমক দিতে গিয়ে মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বললেন, পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা বুঝে উঠতে তাদের সময় লাগবে।
‘আমি মনে হয় সারাজীবন এ নিয়েই ভাবব, কথা বলব,’ যোগ করেন তিনি।
নাসার আর্টেমিস-২ মিশনে রয়েছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন।
গত ১ এপ্রিল শুরু করা ১০ দিনের এই মিশনটি ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো মানুষকে নিয়ে গেছে চাঁদের এত কাছে।
এই অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযান পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৬৫ মাইল দূরে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েছে মানুষের মহাকাশযাত্রার। এর আগে ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো মিশনে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে গিয়েছিলেন মহাকাশচারীরা। আর্টেমিস-২ সেই রেকর্ড ভেঙে পরিণত হয়েছেন ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে যাওয়া মানুষে।
তবে এই মিশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কেবল দূরত্ব নয়, বরং আর্টেমিস-২ ঘুরে এসেছে চাঁদের সেই ‘ফার সাইড’ বা অদেখা পাশ থেকে যা পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না। এর আগে বিভিন্ন উপগ্রহ ওই অংশের ছবি তুললেও এবারই প্রথম তা সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেল মানুষ।
মহাকাশচারীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন চাঁদের বিশাল গহ্বর, লাভায় তৈরি সমতলভূমি এবং বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। কয়েক ঘণ্টা ধরে তারা খালি চোখে যা দেখেছেন, তার বর্ণনা পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে থাকা বিজ্ঞানীদের কাছে।
চাঁদের এই অদেখা পাশে যাওয়ার পথে প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সময় মহাকাশযানটি পৃথিবীর সরাসরি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলেও সেই সময়টাই ছিল মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি।
ওই সময় তারা চাঁদের ভূতত্ত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করছিলেন উল্লেখ করেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান। ‘কাজের ফাঁকে মহাকাশচারীরা কয়েক মিনিটের জন্য থেমেও ছিলেন। জেরেমি হ্যানসেনের সঙ্গে আনা ম্যাপল কুকি সবাই মিলে ভাগ করে খান। তারপর চুপচাপ বসে উপলব্ধি করেন— তারা ঠিক কোথায় আছেন’, বর্ণনা করেন তিনি।
এই সময়ে তারা এমন অনেক কিছু দেখেছেন, যা আগে দেখার সৌভাগ্য হয়নি কারও। ভিক্টর গ্লোভার আবেগ জড়ানো কণ্ঠে জানালেন, চাঁদের দূর পাশ থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। চাঁদ যখন সূর্যের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সূর্যের বাইরের আবরণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যকে তিনি অবহিত করেন ‘বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো’।
মিশনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল যখন মহাকাশচারীরা প্রস্তাব রাখলেন চাঁদের একটি উজ্জ্বল গহ্বরের নামকরণের। তারা ওই গহ্বরটির নাম ‘ক্যারল’ রাখতে চান, কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারোল ওয়াইজম্যানের নামে। যিনি ২০২০ সালে মারা যান ক্যান্সারে।
জেরেমি হ্যানসেন যখন মিশন কন্ট্রোলে ক্যারল নামটি উচ্চারণ করেন, তখন রিড ওয়াইজম্যান নিজেও ভেঙে পড়েন আবেগে। পাশে থাকা ক্রিস্টিনার চোখেও জমে জল। ‘ব্যক্তিগতভাবে এটাই ছিল পুরো মিশনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত’, মন্তব্য করেন ওয়াইজম্যান।
চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিনন্দন জানালেন মহাকাশচারীদের। তিনি বললেন, ‘আজ তোমরা ইতিহাস গড়েছ। তোমরা পুরো আমেরিকাকে গর্বিত করেছ।’
মহাকাশচারীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর খবর তারা পেয়েছেন মূলত পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই। পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে এই মিশন দেখছে, সেটিও জেনেছেন তাদের থেকেই।
এখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসা তাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ। ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে ওরায়ন। তখন মহাকাশযানের বাইরের তাপমাত্রা ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই অসহনীয় উত্তাপ থেকে চার মহাকাশচারীকে রক্ষা করবে ওরিয়নের তাপরোধী ঢাল।
সব ঠিক থাকলে শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৭ মিনিটে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে ওরায়ন। সেখান থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবে মহাকাশচারীদের। আর তাদের সঙ্গে পৃথিবীতে ফিরবে চাঁদের অদেখা পাশের সেই বহু প্রতীক্ষিত ছবি, গল্প আর বৈজ্ঞানিক তথ্য।















