যেসব আমল উপার্জনে বরকত এনে দেয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে উপার্জন শুধু অর্থ-সম্পদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবিকা, পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য, মানসিক প্রশান্তি এবং জীবনযাপনের নিরাপত্তা। প্রত্যেক মানুষই চায় তার উপার্জন বৃদ্ধি পাক, সংসারে সচ্ছলতা আসুক এবং অভাব-অনটন দূর হোক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে উপার্জনের প্রকৃত সাফল্য শুধু অর্থের পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; বরং সেই উপার্জনে কতটুকু কল্যাণ, স্থায়িত্ব ও প্রশান্তি রয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অল্প সম্পদেও যখন মানুষের প্রয়োজন পূরণ হয়, সংসারে শান্তি থাকে এবং অন্যের উপকার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, তখন সেটিই বরকতময় উপার্জন।
বরকত অর্থ প্রাচুর্য, কল্যাণ ও স্থায়ী মঙ্গল। কোনো সম্পদে বরকত থাকলে তা দিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি উপকার পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিপুল অর্থসম্পদ থাকার পরও অনেকের জীবনে স্বস্তি থাকে না। তাই ইসলাম শুধু সম্পদ বৃদ্ধির শিক্ষা দেয় না; বরং উপার্জনকে হালাল, পবিত্র ও বরকতময় করার পথও দেখায়।
উপার্জনে বরকত লাভের অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)। এখান থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তাঁর নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা মানুষের জীবনে অপ্রত্যাশিত কল্যাণের দ্বার খুলে দিতে পারে।
হালাল উপায়ে উপার্জন করাও বরকত লাভের মৌলিক শর্ত। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া, মজুতদারি কিংবা অন্যের অধিকার আত্মসাতের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাহ্যিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও তাতে প্রকৃত কল্যাণ থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই পণ্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের অধিকার রয়েছে, যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়ে যায়। তারা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের দোষ-ত্রুটি স্পষ্ট করে, তবে তাদের বেচাকেনায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের বেচাকেনার বরকত মুছে ফেলা হয়।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭৯) ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা যে বরকতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, এ হাদিসে তা স্পষ্ট হয়েছে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও রিজিকের বরকত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬) আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।
নিয়মিত ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাও রিজিকের বরকত লাভের অন্যতম মাধ্যম। মানুষ জীবনে জেনে-না-জেনে নানা পাপ ও ভুল করে। এসব পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তাঁর রহমত ও অনুগ্রহ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। পবিত্র কুরআনে নুহ (আ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)। এ আয়াত ইস্তিগফারের সঙ্গে রিজিক ও পার্থিব কল্যাণের সম্পর্ক তুলে ধরে।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও বরকত লাভের গুরুত্বপূর্ণ আমল। মানুষ অনেক সময় নিজের প্রাপ্ত নিয়ামতগুলোর দিকে না তাকিয়ে যা নেই, তা নিয়েই বেশি হতাশ থাকে। অথচ কৃতজ্ঞতা নিয়ামত বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)। তাই উপার্জন কম হলেও আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা মুমিনের কর্তব্য।
দান-সদকা সম্পদ কমায় না; বরং তাতে কল্যাণ ও পবিত্রতা নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। অভাবগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, এতিমের দায়িত্ব নেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা বরকত লাভের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে দান হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, লোকদেখানো বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়।
পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং জীবিকা অর্জনে যথাসাধ্য চেষ্টা করাও জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের পাখিদের মতো রিজিক দান করতেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)। এ হাদিসে তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি জীবিকার সন্ধানে চেষ্টা করার শিক্ষাও রয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে বরকতময় উপার্জন শুধু বেশি অর্থ উপার্জনের নাম নয়; বরং হালাল পথে উপার্জন, প্রয়োজন পূরণ, ঋণমুক্ত জীবন, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখা এবং অন্যের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করার সামর্থ্য অর্জনই এর প্রকৃত সৌন্দর্য। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত উপার্জনের ক্ষেত্রে সততা ও আমানতদারি বজায় রাখা, নিয়মিত ইস্তিগফার করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, দান-সদকা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পরিশ্রম করা। এসব আমলের মাধ্যমে মানুষের উপার্জনে আল্লাহর রহমত ও বরকত নেমে আসতে পারে। মনে রাখতে হবে, সম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও কল্যাণময় জীবনই প্রকৃত সফলতা।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক



