বিশ্বময় মুসলিম
বুলগেরিয়ার ব্রানিচেভোতে নতুন মসজিদ উদ্বোধন
- প্রায় এক দশক পর বুলগেরিয়ার ব্রানিচেভোতে মুসলিমদের স্বপ্নের মসজিদ

সংগৃহীত ছবি
বুলগেরিয়ার শুমেন শহরের কাওলিনোভো পৌরসভার অন্তর্গত ব্রানিচেভো গ্রামে গত শনিবার (৪ এপ্রিল) নতুন একটি মসজিদের উদ্বোধন স্থানীয় মুসলিম সমাজে গভীর আনন্দ ও আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় ২৫০ মুসল্লির একসাথে নামাজ আদায়ের উপযোগী এই মসজিদটি শুধু একটি ইবাদতখানা নয়, বরং একটি ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। কারণ, এটি নির্মিত হয়েছে একটি পুরোনো মসজিদের স্থানে, যা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের সেই শূন্যতা পূরণ করতে গ্রামবাসীরা ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং অবশেষে প্রায় এক দশক পর তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়।
মসজিদটিতে অজুর স্থান, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা সংযোজিত হয়েছে, যা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বুলগেরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতি ড. মুস্তফা হাজি, সুপ্রিম ইসলামিক কাউন্সিলের সভাপতি বিদাত আহমেদ, শুমেন শহরের মুফতি মাসউদ মুহাম্মদভ, স্থানীয় মেয়র নিদা আহমেদভসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি এই প্রকল্পের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
গ্র্যান্ড মুফতি তার বক্তব্যে মসজিদটিকে শুধু নামাজের স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মসজিদ নির্মাণে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ঈমানি দায়িত্বও সমানভাবে জরুরি। তার এই বক্তব্য স্থানীয় মুসলিমদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক বার্তা হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। উদ্বোধনের পরপরই প্রথম জুমার নামাজ আদায় করা হয়, যা ছিল আবেগঘন ও স্মরণীয় এক মুহূর্ত।
বুলগেরিয়া একটি ইউরোপীয় দেশ, যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হলেও ঐতিহাসিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি সম্প্রদায়। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বুলগেরিয়ায় প্রায় ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ জন মুসলমান বসবাস করেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯.৮% থেকে ১০.৮%। তবে, গ্র্যান্ড মুফতি অফিসের তথ্যমতে, এই সংখ্যা ৮০০,০০০-এর বেশি হতে পারে। বুলগেরিয়ার মুসলমানরা মূলত সুন্নি মতাবলম্বী এবং জাতিগতভাবে তুর্কি, বুলগেরীয় (পোমাক) ও রোমা জনগোষ্ঠীর। অটোমান শাসনামলের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে বুলগেরিয়ায় ইসলামি সংস্কৃতির একটি গভীর ছাপ বিদ্যমান।
মুসলমানরা সাধারণত মসজিদকেন্দ্রিক জীবনযাপন, ঈদ উদযাপন, রমজানের রোজা, কোরআন শিক্ষা এবং পারিবারিক ধর্মীয় চর্চার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো এখানেও মুসলিমদের কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান না থাকা, ইসলামোফোবিয়ার বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ধর্মীয় অনুশীলনের দুর্বলতা; এসব বিষয় ইউরোপের অন্য সকল দেশের মতো এখানেও বিদ্যমান।
তারপরও বুলগেরিয়ায় মুসলমানরা সংবিধানগতভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেন। মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন এবং ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইসলামিক কাউন্সিল ও মুফতি কার্যালয় মুসলিমদের ধর্মীয় কার্যক্রম সমন্বয় করে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রানিচেভো গ্রামের নতুন মসজিদটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি বুলগেরিয়ার মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক। এটি প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঈমান ও ঐক্যের শক্তিতে একটি সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারে।
সূত্র : আলোকা.নেট থেকে সম্পাদিত



