বেকারত্ব থেকে উদ্যোক্তা: শাওনের অনন্য সাফল্য

ছবি: আগামীর সময়
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) পাস করেও দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছিলেন শাওন ইসলাম। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব তার কাঁধে। তাই কিছু একটা করতেই হবে, এমন চিন্তা সবসময় তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। কিন্তু ব্যবসা শুরু করার মতো পুঁজিও ছিল না। শেষ পর্যন্ত অনলাইনে খোঁজাখুঁজির মাধ্যমে স্বল্প খরচে ও অল্প জায়গায় মাশরুম চাষের ধারণা পান তিনি। সেখান থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু, আর আজ সেই স্বপ্নই বাস্তব।
রংপুর নগরীর নীলকণ্ঠ এলাকার বাসিন্দা শাওন ইসলাম। তিনি ২০২১ সালে রংপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আরইটি) থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং করেন সম্পন্ন। এরপর চাকরির খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও পাননি কোনো সুযোগ। পরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এক মাসব্যাপী কৃষি ও উদ্যান বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে ধারণা লাভ করেন মাশরুম চাষ সম্পর্কে। এরপর অনলাইনের সহায়তায় বিষয়টি ভালোভাবে শিখে ২০২২ সালে শুরু করেন তার মাশরুম চাষের যাত্রা।
শুরুটা ছিল ছোট মাত্র ৫০টি ঝিনুক মাশরুমের স্পন দিয়ে একটি ছোট ঝুপড়ি ঘরে। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ স্পনে। প্রতি ব্যাচে দেড় থেকে দুই মাসে প্রায় ১০০ কেজি মাশরুম হয় উৎপাদন, যা প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বছরে অন্তত ছয়টি ব্যাচে তিনি মাশরুম বিক্রি করে আয় করছেন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাশাপাশি নিজে উৎপাদিত স্পন বিক্রি করে আরও আয় করছেন প্রায় এক লাখ টাকা।
তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি ঘরে দড়িতে ঝুলিয়ে ও মেঝেতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্পনের প্যাকেট। সেগুলো থেকেই বের হচ্ছে তাজা মাশরুম, যা তিনি নিজ হাতে করছেন সংগ্রহ। আরেকটি ঘরে তৈরি হচ্ছে স্পন। প্রতিদিন পানি স্প্রে, পরিচর্যা, সংগ্রহ, প্যাকেটজাতকরণ এবং বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ, সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। ‘আপন সংসার’ নামে তার রয়েছে একটি ফেসবুক পেইজও, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুরিয়ারের মাধ্যমে স্পন করেন সরবরাহ।
শাওনের এই উদ্যোগ এখন এলাকায় ফেলেছে বেশ সাড়া। তার ছোট ভাই নয়ন জানায়, ‘ভাইয়ার এই উদ্যোগ আমাদের সংসারে এনে দিয়েছে স্বচ্ছলতা। আমার চালিয়ে যেতে পারছি পড়াশোনাও। ভবিষ্যতে আমিও হতে চাই তার মতো উদ্যোক্তা।’ মা শাহানা বেগম বললেন, ‘বেকার ছেলের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। কিন্তু শাওন প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। এখন সংসারে এসেছে স্বস্তি।’
স্থানীয়দের মতে, শাওন দেখিয়েছেন শূন্য থেকে শুরু করেও সফল হওয়া সম্ভব। শুধু মাশরুম চাষ নয়, তিনি এখন স্পন উৎপাদন করে সরবরাহ করছেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। ক্রেতারাও তার উৎপাদিত মাশরুমের গুণগত মানে সন্তুষ্ট।
শাওনের ভাষায়, ‘অল্প পুঁজি, কম জায়গা আর স্বল্প সময়েই মাশরুম চাষে ভালো লাভ করা যায়। এটি আমাকে করেছে স্বাবলম্বী।’ তিনি জানান, মাশরুম ফ্রিজে ৭-১০ দিন, সিদ্ধ করে ডিপ ফ্রিজে ২-৩ মাস এবং শুকিয়ে ৭-৮ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। গত বছর তিনি প্রায় ৩ হাজার স্পন বিক্রি করে আয় করেছেন প্রায় ৯০ হাজার টাকা।
বেকার তরুণদের উদ্দেশে শাওনের পরামর্শ, বাড়ির ছোট জায়গাতেও সহজে মাশরুম চাষ করা সম্ভব। ঝিনুক মাশরুম দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণের কারণে বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই স্বল্প পুঁজিতে শুরু করে যে কেউ হতে পারেন একজন সফল উদ্যোক্তা।



