কোরআনের বাণী
নবীপ্রেম কেবল অনুভূতি নয়, আচরণের বিষয়
- আদবের অভাবেই আমল বিনষ্টের আশঙ্কা
- নবীর প্রতি আদব; একটি চিরন্তন ঈমানি শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ০২
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَرْفَعُوٓاْ أَصْوَٲتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ ٱلنَّبِىِّ وَلَا تَجْهَرُواْ لَهُۥ بِٱلْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَـٰلُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
অনুবাদ:
২. হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সাথে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না; এ আশঙ্কায় যে, তোমাদের সকল কাজ বিনষ্ট হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।
আলোচ্য আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মজলিসের এটা দ্বিতীয় আদব। যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে ওঠাবসা ও যাতায়াত করতেন। তাদেরকে এ আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া হয়েছিলো।
এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, এতে ইসলামে আদব, শিষ্টাচার এবং বিশেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, কিছু সাহাবি; বিশেষত বেদুঈনদের মধ্যে কেউ কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলার সময় নিজেদের স্বাভাবিক অভ্যাস অনুযায়ী উচ্চস্বরে কথা বলতেন। একবার বনু তামীম গোত্রের প্রতিনিধিরা এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে তাদের নেতা নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর মধ্যে কথাবার্তা কিছুটা উচ্চস্বরে হয়ে যায়। তখনই এই আয়াত নাযিল হয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৮৪৫-৪৮৪৭)
আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এক অসাধারণ পরিবর্তন আসে। তারা এতটাই সতর্ক হয়ে যান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে প্রায় ফিসফিস করে কথা বলতেন। সাবেত ইবনে কায়স (রা.), যার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকভাবেই উঁচু ছিল, তিনি ভয়ে মনে করেছিলেন তার আমল নষ্ট হয়ে গেছে। পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জানালেন, তিনি জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত। (বুখারী, হাদীস: ৪৮৪৬)
এই আয়াতের মূল শিক্ষা কেবল কণ্ঠস্বর নিচু রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নবীর প্রতি অন্তরের গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা এবং আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। এখানে ‘আমল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার’ যে ভয় দেখানো হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক একটি ছোট্ট আচরণও যদি নবীর মর্যাদার পরিপন্থী হয়, তবে তা ঈমান ও আমলের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান সময়ে এই আয়াতের আবেদন আরও বিস্তৃত ও গভীর। আজ আমরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে উপস্থিত নই, কিন্তু তাঁর সুন্নাহ, তাঁর হাদীস, তাঁর নাম ও তাঁর শিক্ষার প্রতি আমাদের আচরণই এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন।
প্রথমত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বা সুন্নাহ শোনার পর তা অবহেলা করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা নিজের মতামতকে তার উপর প্রাধান্য দেওয়া; এটি এই আয়াতের চেতনার পরিপন্থী। পবিত্র কোরআন অন্যত্র বলেছে: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রসর হয়ো না।’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১)
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম উচ্চারণের সময়, তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করার সময় বা তাঁর জীবন নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় যথাযথ সম্মান বজায় রাখা জরুরি। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ অবিবেচক ভাষা ব্যবহার করে বা অজ্ঞতাবশত এমনভাবে কথা বলে, যা আদবের পরিপন্থী; এটি এই আয়াতের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।
তৃতীয়ত, মসজিদে নববী বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরীফের সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকা; এটিও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। উমর (রা.) এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে- উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দুই ব্যক্তিকে মসজিদে নববীতে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কোথাকার লোক? তারা বললঃ আমরা তায়েফের লোক। তিনি বললেন, যদি তোমরা মদীনাবাসী হতে তবে আমি তোমাদের বেত্ৰাঘাত করতাম। তোমরা রাসূলের মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলছ কেন? (বুখারী, হাদিস: ৪৭০)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; এই আয়াত আমাদেরকে বাহ্যিক আচরণের মাধ্যমে অন্তরের অবস্থাকে শুদ্ধ করতে শেখায়। কণ্ঠস্বর নিচু রাখা আসলে অন্তরের বিনয়, শ্রদ্ধা এবং নবীপ্রেমের প্রতিফলন। যে হৃদয়ে সত্যিকার ভালোবাসা থাকে, তার আচরণে স্বাভাবিকভাবেই আদব ও শালীনতা প্রকাশ পায়।
সুতরাং, এই আয়াত শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার নির্দেশনা নয়; বরং এটি একটি চিরন্তন নীতি; যেখানে শেখানো হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই সম্মান কেবল কথায় নয়, বরং চিন্তা, আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।



