পাখি মহান আল্লাহর অনন্য নিদর্শন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই আমাদের কানে ভেসে আসে পাখির কণ্ঠস্বর। কখনো দোয়েলের সুর, কখনো কোকিলের ডাক, কখনো শালিকের কিচিরমিচির। মনে হয়, প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো যেন প্রতিদিন নতুন করে পৃথিবীকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে। কাছে পাখি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে তারা মহান আল্লাহর অসীম কুদরত, প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশৈলীর এক বিস্ময়কর নিদর্শন।
পবিত্র কোরআন মানুষকে বারবার সৃষ্টিজগতের দিকে তাকাতে আহ্বান জানিয়েছে। পাখির উড্ডয়নও সেই চিন্তার অন্যতম বিষয়। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কি তাদের ওপর উড়ে বেড়ানো পাখিদের দিকে তাকায় না? তারা কখনো ডানা বিস্তার করে, কখনো গুটিয়ে নেয়। পরম করুণাময় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাদের ধরে রাখে না। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছুই সম্যক দেখেন।’ (সুরা মুলক, আয়াত : ১৯)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা কি আকাশমণ্ডলের শূন্যে নিয়ন্ত্রিত পাখিদের দিকে লক্ষ্য করে না? আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাদের ধরে রাখে না। নিশ্চয় এতে ঈমানদারদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৭৯)
বিজ্ঞানের ভাষায় পাখির উড্ডয়ন বায়ুগতিবিদ্যা, অস্থির গঠন, পালকের বিন্যাস ও পেশির সমন্বয়ের এক বিস্ময়কর উদাহরণ। কিন্তু কোরআন মানুষের দৃষ্টি আরও গভীরে নিয়ে যায়। পবিত্র কোরআন মানুষকে শুধূ ‘কীভাবে’ প্রশ্নে আটকে না রেখে ‘কার ইচ্ছায়’ এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে সে প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে বলে। তাই একজন মুমিন যখন আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির দিকে তাকায়, তখন তিনি মহান স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার এক জীবন্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন।
পাখিরা আল্লাহর ইবাদতেও নিয়োজিত। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তুমি কি দেখ না, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে এবং ডানা বিস্তারকারী পাখিরাও আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার নামাজ ও তাসবিহ সম্পর্কে অবগত।’ (সুরা নূর, আয়াত : ৪১)
আমরা হয়তো তাদের ভাষা বুঝি না, কিন্তু তাদের প্রতিটি উড্ডয়ন, প্রতিটি ডাক এবং প্রতিটি অস্তিত্ব আল্লাহর প্রশংসার অংশ। মানুষের চোখে যে পাখি নিছক একটি প্রাণী, কোরআনের দৃষ্টিতে সে একজন অনুগত সৃষ্টিজীব।
আল্লাহর নবীদের জীবনেও পাখির বিশেষ উপস্থিতি দেখা যায়। সুলাইমান (আ.)-এর সেনাবাহিনীতে হুদহুদ পাখির ভূমিকার কথা কোরআনে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। হুদহুদই সাবা রাজ্যের সংবাদ এনে দিয়েছিল। এক নারীর নেতৃত্বাধীন জাতির আল্লাহবিমুখতার কথা জানিয়েছিল। (সুরা নামল, আয়াত : ২০-২৮ আয়াতগুলোতে যার বিবরণ রয়েছে ) এই ঘটনা প্রমাণ করে, মহান আল্লাহ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষুদ্রতম সৃষ্টিকেও মাধ্যম বানাতে পারেন।
আবার কাবা শরিফ রক্ষার ঘটনায় আবাবিল পাখির কথা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। যখন আবরাহা হস্তি বাহিনী নিয়ে কাবা ধ্বংস করতে এগিয়ে এলো, তখন আল্লাহ ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি পাঠিয়ে তাদের ওপর পোড়া মাটির কঙ্কর নিক্ষেপ করেন এবং তাদের পরাজিত করেন। (সুরা আল-ফিল) এতে স্পষ্ট হয়, শক্তির প্রকৃত উৎস মানুষের বাহুবল নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন, আর পাখিও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একটি চড়ুই বা তার চেয়ে বড় কোনো প্রাণী হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কাছে এর হিসাব নেবেন।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এর ন্যায্য অধিকার কী?’ তিনি বললেন, ‘প্রয়োজনে জবাই করে খাবে; শুধু হত্যা করে ফেলে রাখবে না।’ (নাসাঈ, হাদিস: ৪৪৪৫)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরও সেইভাবে রিজিক দিতেন, যেভাবে তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।" (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)
এই হাদিস শুধু রিজিকের শিক্ষা নয়; এটি কর্ম, ভরসা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এক অনন্য পাঠ। পাখি বাসায় বসে থাকে না; সে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়, চেষ্টা করে, আর আল্লাহ তার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেন।
আজ পৃথিবীর বহু পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নির্বিচারে শিকারের কারণে অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসলাম মানুষকে পৃথিবীর খলিফা বা দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ৩০) তাই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণও একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। পাখির আবাস রক্ষা করা, অকারণে শিকার না করা এবং প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা ইবাদতের চেতনারই অংশ।
আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া একটি পাখি আমাদের শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখায় না; সে আমাদের ঈমানকেও জাগিয়ে তোলে। তার উড্ডয়ন আমাদের শেখায়, প্রতিটি সৃষ্টি আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে চলছে। তার কণ্ঠের সুর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সমগ্র বিশ্বজগত এক মহান রবের তাসবিহে মুখর। তাই যখনই কোনো পাখি আকাশে উড়ে যায়, একজন মুমিনের হৃদয়ে উচ্চারিত হওয়া উচিত, ‘সুবহানাল্লাহ!’ কারণ সেই ক্ষুদ্র ডানার ভাঁজে লুকিয়ে আছে মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
লেখক: শিক্ষার্থী, এনআকন্দ কামিল মাদরাসা নেত্রকোণা।




