মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব গুণাবলি ও সামাজিক অবস্থান

প্রতীকী ছবি
(প্রথম পর্বের পর)
মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব জীবনে দয়া ও মানবিকতাও ছিল গভীরভাবে বিদ্যমান। তিনি এতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তার এই কোমল হৃদয় পরবর্তী নবুয়্যতি জীবনে আরও পূর্ণতা লাভ করে। হজরত খাদিজা (রা.) ওহি নাজিলের প্রথম ঘটনার পর তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তার যেসব গুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দুর্বলদের সাহায্য, অসহায়দের দায়িত্ব নেওয়া, অতিথির সম্মান করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুর্বলের বোঝা বহন করেন, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করেন, অতিথির আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান।’ (বুখারি, হাদিস : ৩)
নবুয়্যতের আগে তিনি নির্জনতা ও চিন্তাশীলতাও পছন্দ করতেন। মক্কার নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয় তাকে ব্যথিত করত। তিনি হেরা গুহায় গিয়ে একাকী অবস্থান করতেন এবং আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, ওহি নাজিল হওয়ার আগে তার কাছে নির্জনতা প্রিয় করে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি হেরা গুহায় অবস্থান করে ইবাদত করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৩)
এখানে তার সামাজিক অবস্থানের আরেকটি দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি ছিলেন কুরাইশের সম্মানিত বংশের সন্তান, কিন্তু বংশীয় মর্যাদা তাকে অহংকারী করে তোলেনি। পিতা-মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠা, রাখাল হিসেবে কাজ করা এবং পরে ব্যবসায় যুক্ত হওয়া তার জীবনকে সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামের কাছাকাছি রেখেছিল। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি, যিনি মেষ চরাননি।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, তিনিও মক্কার মানুষের জন্য কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মেষ চরাতেন। (বুখারি, হাদিস : ২২৬২)
মক্কায় তার সামাজিক মর্যাদা অবশ্য শুধু বংশের কারণে ছিল না। তার ব্যক্তিগত চরিত্র, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, প্রজ্ঞা ও মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতাই তাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। এ কারণেই যখন তিনি প্রকাশ্যে আল্লাহর একত্বের দিকে মানুষকে আহ্বান করতে শুরু করেন, তখন তার বিরোধীরাও তার দীর্ঘদিনের সত্যবাদিতা অস্বীকার করতে পারেনি। তিনি যখন সাফা পাহাড়ে কুরাইশদের ডেকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি যদি তোমাদের বলি, এই পাহাড়ের পেছনে একটি বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?’ তারা বলেছিল, ‘আমরা আপনার কাছ থেকে কখনো মিথ্যা শুনিনি।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৭৭০)
অতএব, মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব জীবন ছিল নবুয়্যতের প্রস্তুতিপর্বের মতো। আল্লাহ তাকে এমন এক সমাজে গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে চারপাশের নৈতিক অন্ধকারের মধ্যেও তার চরিত্র ছিল আলোর মতো স্বতন্ত্র। তিনি ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ, বিচক্ষণ, দয়ালু, আত্মমর্যাদাশীল ও মানুষের কল্যাণকামী। মক্কার সমাজ তাকে ‘আল-আমিন’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল; তার বিচারবুদ্ধির ওপর গোত্রগুলো আস্থা রেখেছিল; ব্যবসায় তার সততা তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল; আর তার মানবিকতার সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
তাই মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব জীবনকে শুধু নবুয়্যতের আগের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখলে তার ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায় না; বরং তার জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করে, আল্লাহ যাকে বিশ্বমানবতার জন্য শেষ নবী হিসেবে নির্বাচন করেছেন, তাকে শৈশব থেকেই নির্মাণ করেছেন সত্য, পবিত্রতা, ন্যায় ও মানবিকতার ওপর। নবুয়্যতের পর তার চরিত্র যে পূর্ণাঙ্গ আদর্শে পরিণত হয়েছিল, তার বীজ নিহিত ছিল তার নবুয়্যতপূর্ব জীবনেই। কোরআনের ভাষায়, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম, আয়াত : ৪)
মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতপূর্ব জীবন তাই শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, মানবচরিত্র ও নেতৃত্বের ইতিহাসের জন্যও এক অনন্য শিক্ষার অধ্যায়। সমাজ পরিবর্তনের আগে নিজেকে সত্য, আমানত ও ন্যায়ের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করা, মানুষের আস্থা অর্জন করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবিক অবস্থান নেওয়া যে একজন মহান নেতৃত্বের ভিত্তি, তার জীবন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






