সিরাত
যে হৃদয় ছিল সবার জন্য কোমল

প্রতীকী ছবি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল দয়া, মমতা, সহানুভূতি ও কোমলতার অপূর্ব সমন্বয়। তিনি শুধু একজন নবী ছিলেন না, বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭) তাঁর কোমলতা দুর্বলতার পরিচয় ছিল না; বরং তা ছিল মানুষের হৃদয় জয় করার এক অসাধারণ শক্তি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনকে ঈমানি চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,
مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ
‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭; মুসলিম, হাদিস: ২৩১৮) অর্থাৎ মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ শুধু সামাজিক সৌজন্যের বিষয় নয়। এর সঙ্গে আল্লাহর রহমত লাভের সম্পর্ক রয়েছে। তাই একজন মুমিনের হৃদয় হওয়া উচিত কোমল, সংবেদনশীল ও অন্যের কষ্ট অনুভব করতে সক্ষম।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমলতার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো, তাঁর প্রতি অবমাননাকর আচরণ করলেও তিনি সহজে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতেন না। একবার কিছু লোক তাঁর কাছে এসে অন্যের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার আবেদন জানালে তিনি বললেন,
إِنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعَّانًا، وَإِنَّمَا بُعِثْتُ رَحْمَةً
‘আমি অভিশাপদাতা হিসেবে প্রেরিত হইনি; বরং আমাকে রহমত হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৯) তাঁর এই বক্তব্যে নবুয়তি চরিত্রের একটি মৌলিক দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্যের অপরাধ তাঁকে তাঁর নিজের উত্তম চরিত্র থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
তাঁর কোমলতা সবচেয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে কঠিন পরিস্থিতিতেও। একবার কিছু ইহুদি তাঁর কাছে এসে ‘আসসালামু আলাইকুম’-এর পরিবর্তে বিকৃত করে ‘আসসামু আলাইকুম’ বলল, যার অর্থ ‘তোমার মৃত্যু হোক’। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তা শুনে খুব রেগে গেলেন আর প্রতিবাদ করলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, ‘হে আয়েশা, কোমল হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে কোমলতা পছন্দ করেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৬২৫৬; মুসলিম, হাদিস: ২১৬৫) অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়েও ভাষা ও আচরণে সংযম রক্ষা করার এই শিক্ষা আজকের উত্তেজনাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমল আচরণের প্রশংসা করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ
‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’ এরপর বলা হয়েছে, ‘আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯) এ আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে কঠোরতার চেয়ে কোমলতা অনেক বেশি কার্যকর।
শুধু মানুষের সঙ্গে নয়, শিশু, নারী, দুর্বল ও অসহায়দের প্রতিও তাঁর হৃদয় ছিল গভীরভাবে সংবেদনশীল। নামাজে শিশুর কান্না শুনলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে তার মায়ের কষ্ট না হয়। তিনি বলেছেন,
إِنِّي لَأَقُومُ فِي الصَّلَاةِ أُرِيدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِي صَلَاتِي كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ
‘আমি নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াই; কিন্তু শিশুর কান্না শুনলে তার মায়ের কষ্ট হবে ভেবে নামাজ সংক্ষিপ্ত করি।’ (বুখারি, হাদিস: ৭০৭; মুসলিম, হাদিস: ৪৭০)
আজকের পৃথিবীতে মতের অমিল, সামাজিক বিরোধ ও পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা যখন সম্পর্ককে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমল চরিত্র আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। তিনি শিখিয়েছেন, সত্যের ওপর অটল থেকেও হৃদয় কোমল রাখা যায়; অন্যায়ের প্রতিবাদ করেও ভাষায় শালীন থাকা যায়; ক্ষমতা হাতে থাকলেও প্রতিশোধ না নিয়ে রহমতের পথ বেছে নেওয়া যায়। তাই নবীজির প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ শুধু তাঁর প্রশংসা করা নয়, বরং তাঁর কোমলতা ও রহমতের চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করাই প্রকৃত ভালোবাসা।
মানুষের প্রতি আমাদের একটি কোমল কথা, একটি ক্ষমাশীল আচরণ কিংবা একটি সহানুভূতিশীল হাত হয়তো কারও কাছে নবীজির সেই মহান আদর্শেরই জীবন্ত পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নববী চরিত্রের আলোকে জীবন সাজানোর তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






