নবীজীবনের বাঁকে বাঁকে
মহানবী (সা.) এর জন্মলগ্নে বিশ্ব পরিস্থিতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আবির্ভাব মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন বিশ্বের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল। ইসলামী ঐতিহাসিকগণ এ সময়কে 'জাহেলিয়াতের যুগ' নামে অভিহিত করেছেন। তবে এই জাহেলিয়াত শুধূ আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিশ্বের বৃহৎ সভ্যতাগুলোও নানা ধরনের অবক্ষয়, শোষণ ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিল। ঠিক এমন এক অন্ধকার সময়েই আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেন শেষ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে।
বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা
ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি ছিল রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্য এবং পারস্য সাম্রাজ্য। দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে চলমান যুদ্ধ উভয় সাম্রাজ্যকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছিল। ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন তাঁর The History of the Decline and Fall of the Roman Empire-এ উল্লেখ করেছেন, অবিরাম যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোমান সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল।
এই যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের ওপর বেড়ে যায় করের বোঝা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি ও বাণিজ্য। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে নিরাপত্তাহীনতা। পবিত্র কোরআনের সুরা রূমের ২ থেকৈ ৪ নং আয়াতেও রোমান ও পারস্যের সংঘাতের প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে।
ধর্মীয় বিভ্রান্তি ও আধ্যাত্মিক সংকট
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঐশী ধর্মের মূল শিক্ষা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ইহুদিদের একাংশ আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা পরিবর্তন করেছিল এবং ধর্মকে জাতিগত গর্বের উপকরণে পরিণত করেছিল। যার বিবরণ পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার পঁচাত্তর ও উনআশি নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
খ্রিস্টান সমাজে তাওহিদের পরিবর্তে ত্রিত্ববাদ এবং নানা ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন গির্জার মধ্যে মতভেদ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ক্যারেন আর্মস্ট্রং তার Muhammad: A Prophet for Our Time-এ উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় সমাজগুলো তখন বিভক্তি ও মতবিরোধে জর্জরিত ছিল।
অন্যদিকে আরব উপদ্বীপে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতিষ্ঠিত কাবা শরিফে প্রায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। আল্লাহর একত্ববাদ প্রায় বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ)
আরব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়
মহানবী (সা.)-এর জন্মের পূর্বে আরব সমাজে গোত্রীয় অহংকার ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়। ক্ষুদ্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। হারবুল ফিজার এবং দাহিস-গাবরা যুদ্ধ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
মদ্যপান, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার এবং শক্তিশালীর হাতে দুর্বলের নির্যাতন ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
নারীর করুণ অবস্থান
সে সময় অধিকাংশ সমাজেই নারীরা ছিলেন সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আরবে কন্যাসন্তান জন্মকে লজ্জাজনক মনে করা হতো। অনেক পরিবার জীবন্ত কন্যাশিশুকে মাটিতে পুঁতে ফেলত। কোরআন এ নির্মমতার চিত্র তুলে ধরে বলেছে, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভীর, আয়াত : ৮-৯)
নারীরা উত্তরাধিকার পেতেন না, নিজের বিবাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও তাদের হাতে ছিল না। ইসলাম এসে নারীদের সম্মান, সম্পত্তির অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য
ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ছিল প্রকট। সুদভিত্তিক লেনদেন সমাজে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ঋণের বোঝায় অসংখ্য মানুষ দাসত্বে পতিত হতো। ব্যবসায় প্রতারণা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
পরবর্তীকালে কোরআন সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে (সুরা আল-বাকারা, ২:২৭৫-২৭৯) এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়।
দাসপ্রথার ব্যাপক বিস্তার
বিশ্বের প্রায় সব সভ্যতায় দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। যুদ্ধবন্দী, দরিদ্র কিংবা অপহৃত মানুষকে দাসে পরিণত করা হতো। তাদের মানবিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না।
মহানবী (সা.) দাসমুক্তিকে ইবাদতের মর্যাদা দেন এবং দাসদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন। তাঁর জীবনের বাস্তব উদাহরণ ছিল যায়েদ ইবন হারিসা (রা.), বিলাল ইবন রাবাহ (রা.) প্রমুখ সাহাবিদের প্রতি তাঁর আচরণ।
নৈতিক নেতৃত্বের সংকট
সমাজে এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক নেতৃত্ব ছিল না, যিনি মানবজাতিকে এক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করতে পারতেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল শক্তির ওপর নির্ভরশীল, ন্যায়বিচারের ওপর নয়। সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আমি তো আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)
মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব শুধু একটি ধর্মের সূচনা ছিল না; বরং এটি ছিল নৈতিক পুনর্জাগরণ, সামাজিক সংস্কার, মানবমুক্তি এবং বিশ্বসভ্যতার নতুন দিগন্তের সূচনা।
মোট কথা মহানবী (সা.)-এর জন্মলগ্নের বিশ্ব ছিল রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় বিভ্রান্তি, সামাজিক বৈষম্য, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানবিক সংকটে পরিপূর্ণ। এমন এক সময়ে তাঁর আগমন ছিল মানবজাতির জন্য আল্লাহর এক মহা অনুগ্রহ। তিনি মানুষের সামনে এমন এক জীবনব্যবস্থা উপস্থাপন করেন, যেখানে তাওহিদ, ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, জ্ঞান, দয়া এবং ভ্রাতৃত্ব এক সুসংহত সভ্যতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাই তাঁর জন্ম শুধু আরবের ইতিহাস নয়, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।




