জুলুমের শেষ পরিণতি পরাজয়

প্রতীকী ছবি
জুলুম পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুগে যুগে ক্ষমতাবানরা দুর্বলকে দমিয়েছে, স্বার্থপররা অধিকার কেড়ে নিয়েছে, আর নির্যাতিত মানুষকে নীরবে সহ্য করতে হয়েছে অনাচার-অত্যাচার। কখনো মনে হয়েছে জালিমের শক্তির কাছে মজলুমের আর্তনাদ বুঝি হারিয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস ও ওহির শিক্ষা হলো- জুলুম যতই দীর্ঘ হোক; তার পরিণতি কখনো কল্যাণকর হয় না। আল্লাহ তাআলার ন্যায়বিচারের বিধান অটল। জালিমের জন্য পরিণামে পরাজয় এবং মজলুমের জন্য বিজয়ের পথই উন্মুক্ত হয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘জালিমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো উদাসীন মনে করো না। তিনি তাদের অবকাশ দেন সেই দিন পর্যন্ত, যেদিন তাদের চোখ স্থির হয়ে যাবে।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪২)। এই আয়াত মজলুমের জন্য এক গভীর সান্ত্বনা। জালিম পৃথিবীতে কিছু সময়ের জন্য অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে, ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারে, অন্যের অধিকার হরণ করতে পারে; কিন্তু আল্লাহ তার কোনো কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অজ্ঞ নন। যে অবকাশকে জালিম নিজের নিরাপত্তা মনে করে; সেটিই কখনো কখনো তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সঞ্চয়ের সময় হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, যাদের পৃথিবীতে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদের নেতা করতে এবং তাদের উত্তরাধিকারী করতে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৫)। মিসরের ফেরাউন বনি ইসরাইলের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছিল। শিশুদের হত্যা, নারীদের জীবিত রাখা এবং একটি জনগোষ্ঠীকে অপমান-অবদমনের মধ্যে রাখাই ছিল তার শাসনের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। যাদের দুর্বল মনে করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাদেরই নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের মর্যাদা দেওয়া হলো। এ ঘটনা শুধু অতীতের একটি কাহিনি নয়; বরং জুলুমের বিরুদ্ধে আল্লাহর চূড়ান্ত বিধানের একটি দৃষ্টান্ত।
মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৮)। অর্থাৎ যার ওপর অন্যায় করা হয়েছে; তার আর্তনাদকে তুচ্ছ করার সুযোগ নেই। একজন মানুষ হয়তো আদালতে বিচার পাওয়ার ক্ষমতা রাখে না, তার হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার শক্তি নেই, তার কণ্ঠ হয়তো ক্ষমতাবানের কাছে পৌঁছায় না; কিন্তু তার কান্না আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) মজলুমের দোয়া সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
ইসলাম শুধু জালিমের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার পাশাপাশি জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ারও শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন,
‘তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক অথবা মজলুম।’ সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, মজলুমকে সাহায্য করা বুঝলাম; কিন্তু জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, ‘তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে; এটাই তাকে সাহায্য করা।’ (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৪)।
মজলুমের বিজয় মানে সবসময় দুনিয়াতেই তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত হতে দেখা নয়। কখনো বিজয় আসে অধিকার ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে, কখনো জালিমের পতনের মধ্য দিয়ে, আবার কখনো আখিরাতের চূড়ান্ত বিচারে। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৫৭)। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অপছন্দের পথে নিজেকে পরিচালিত করে, তার বাহ্যিক সাফল্য যত বড়ই হোক, প্রকৃত অর্থে সে পরাজিত।
তাই জুলুমের শিকার মানুষকে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যায়কারীর শক্তি দেখে সত্যের ওপর আস্থা হারানোরও সুযোগ নেই। মজলুমের দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা, বৈধ উপায়ে নিজের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। আর সমাজের দায়িত্ব হলো জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, মজলুমের পাশে থাকা এবং জালিমকে তার অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনা। কারণ জুলুমের স্থায়িত্ব যত দীর্ঘই মনে হোক; আল্লাহর ন্যায়বিচারের সামনে তার কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় এবং কোরআনের প্রতিটি সতর্কবার্তা যেন একই সত্য উচ্চারণ করে—
জুলুমের রাত যত দীর্ঘ হোক, ন্যায়ের সকাল আসবেই; মজলুমের অশ্রু একদিন বিজয়ের সাক্ষ্য দেবে, আর জালিমের শক্তি পরিণামে পরাজয়ের কারণ হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






