হাদিসের গল্প
বিস্ময়কর উপায়ে ঋণ পরিশোধ
- তাওয়াক্কুলের বিস্ময়কর প্রাপ্তি ও আমানতের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন দুনিয়ার সব হিসাব-নিকাশ ব্যর্থ হয়ে যায়; চোখে দেখা কোনো পথ থাকে না, হাতে ধরার কোনো উপায়ও অবশিষ্ট থাকে না। তখন একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় অদৃশ্য এক শক্তি, যার ওপর নির্ভর করেই মানুষ খুঁজে পায় অন্ধকারের ভেতর আলো। ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। দেখা গেছে, মানুষের সীমাবদ্ধতা যেখানে শেষ, ঠিক সেখানেই আল্লাহর কুদরতের সূচনা দৃশ্যমান হয়েছে। যাতে স্পষ্ট হয়, যে হৃদয় সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে পারে, তার জন্য অসম্ভবও একদিন সহজ হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে নিচের হাদিসের বিস্ময়কর ঘটনাটি দেখুন—
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনি ইসরাঈলের কোনো এক ব্যক্তি বনি ইসরাঈলের অন্য এক ব্যক্তির কাছে এক হাজার দিনার ঋণ চাইল। তখন সে (ঋণদাতা) বলল, কয়েকজন সাক্ষী আনো, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। সে বলল, সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। তারপর (ঋণদাতা) বলল, তাহলে একজন জামিনদার উপস্থিত কর। সে বলল, জামিনদার হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। ঋণদাতা বলল, তুমি সত্যিই বলেছ। এরপর নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের শর্তে তাকে এক হাজার দিনার দিয়ে দিল।
তারপর ঋণগ্রহীতা সামুদ্রিক সফর করল এবং তার প্রয়োজন সমাধা করে সে যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণদাতার কাছে এসে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সে কোনো যানবাহন পেল না। তখন সে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং ঋণদাতার নামে একখানা পত্র ও এক হাজার দিনার তার মধ্যে ভরে ছিদ্রটি বন্ধ করে সমুদ্রতীরে এসে বলল, হে আল্লাহ! তুমি তো জানো আমি অমুকের কাছে ১ হাজার দিনার ঋণ চাইলে সে আমার কাছে জামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই জামিন হিসেবে যথেষ্ট। এতে সে রাজি হয়। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট, তাতে সে রাজি হয়ে যায়। আমি তার ঋণ (যথাসময়ে) পরিশোধের উদ্দেশ্যে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি; কিন্তু পাইনি। তাই আমি তোমার কাছে সোপর্দ করলাম, এই বলে সে কাঠের খণ্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করল। আর কাষ্ঠখণ্ডটি সমুদ্রে প্রবেশ করল।
অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল।
এদিকে ঋণদাতা এই আশায় সমুদ্রতীরে গেল যে, হয়তো বা ঋণগ্রহীতা কোনো নৌযানে করে তার মাল নিয়ে এসেছে। তার দৃষ্টি কাষ্ঠখণ্ডটির ওপর পড়ল, যার ভেতরে মাল ছিল। সে কাষ্ঠখণ্ডটি তার পরিবারের জ্বালানির জন্য বাড়ি নিয়ে গেল। যখন তা চিরল, তখন সে পেয়ে গেল মাল ও পত্রটি।
কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা ১ হাজার
দিনার নিয়ে এসে হাজির হলো এবং বলল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথাসময়ে পৌঁছিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সব সময় যানবাহনের খোঁজে ছিলাম। কিন্তু আমি যে নৌযানে এখন এলাম, তার আগে আর
কোনো নৌযান পাইনি। ঋণদাতা বলল, তুমি কি আমার কাছে কিছু পাঠিয়েছিলে? ঋণগ্রহীতা বলল, আমি
তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোনো নৌযান আমি পাইনি। সে বলল, তুমি কাঠের টুকরোর ভেতরে
যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন। তখন সে আনন্দচিত্তে
১ হাজার দিনার নিয়ে ফিরে এলো।
ওপরের হাদিসে বর্ণিত গল্পটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে, বিশ্বাস,
আমানতদারিত্ব ও তাওয়াক্কুল; এই তিনটি গুণ মানুষের চরিত্রকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়,
যেখানে দুনিয়ার প্রচলিত নিয়মও যেন নতুনভাবে কাজ করতে শুরু করে। গল্পটিতে একটি কাঠের
টুকরো, এক অজানা সমুদ্রযাত্রা, আর একজন সৎমানুষের অন্তরের ডাক। সবকিছু মিলিয়ে এমন
এক প্রেক্ষিত রচনা করেছে, যা কেবল গল্প নয়; বরং ঈমানের গভীরতা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার
এক জীবন্ত দলিল।
এ হাদিসটি সেই অসাধারণ ঘটনারই বর্ণনা, যেখানে একজন বান্দার আন্তরিকতা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এমন এক পরিণতি এনে দেয়, যা মানববুদ্ধির সীমা অতিক্রম করে যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।

