কোরআনের বাণী
অপবাদ, সাক্ষ্য ও দাম্পত্য ন্যায়বিচারে কোরআনের অনন্য বিধান

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ৬
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ الَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ اَزۡوَاجَهُمۡ وَ لَمۡ یَكُنۡ لَّهُمۡ شُهَدَآءُ اِلَّاۤ اَنۡفُسُهُمۡ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمۡ اَرۡبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّهٗ لَمِنَ الصّٰدِقِیۡنَ
৬. আর যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের কোনো সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য এ হবে যে, সে আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে নিশ্চয় সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
এ আয়াতটি সূরা আন-নূরের ৬ নম্বর আয়াত। এখানে ইসলামে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান তুলে ধরা হয়েছে।
এই আয়াতের পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবিক ও আইনি প্রেক্ষাপট। ইসলামে কাউকে ব্যভিচারের অপবাদ দিতে হলে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আবশ্যক। এটি মানুষের সম্মান ও পারিবারিক মর্যাদা রক্ষার জন্য অত্যন্ত কঠোর বিধান। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন একটি ব্যক্তিগত ক্ষেত্র, যেখানে অনেক সময় অন্য কোনো সাক্ষী উপস্থিত থাকে না। একজন স্বামী যদি নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ করেন, অথচ চারজন সাক্ষী হাজির করতে না পারেন, তাহলে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তার ওপর ‘কাযফ’ বা মিথ্যা অপবাদের শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এতে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কারণ স্বামী হয়তো সত্যিই কিছু দেখেছেন, অথচ সাক্ষী আনা সম্ভব নয়।
এই জটিলতার সমাধান হিসেবেই আল্লাহ
তাআলা ‘লিআন’ নামক বিশেষ বিধান নাজিল করেন। এখানে স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ
করে বলবেন যে তিনি সত্যবাদী। এরপর পঞ্চমবার বলবেন, যদি তিনি মিথ্যাবাদী হন তবে আল্লাহর
লানত তার ওপর বর্ষিত হোক। এরপর স্ত্রীও যদি অভিযোগ অস্বীকার করেন, তবে তিনিও
চারবার শপথ করে নিজের নির্দোষিতা ঘোষণা করবেন এবং পঞ্চমবার বলবেন, যদি স্বামী
সত্যবাদী হন তবে আল্লাহর গজব তার ওপর নেমে আসুক।
(সূরা আন-নূর, আয়াত ৬-৯)
হাদিসে এসেছে, এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পেছনে হিলাল ইবন উমাইয়া (রা.)-এর ঘটনা ছিল। তিনি তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘প্রমাণ হাজির করো, নতুবা তোমার পিঠে শাস্তি কার্যকর হবে।’ তখন হিলাল (রা.) অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে বলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কেউ যদি নিজের স্ত্রীর সাথে অন্য কাউকে দেখে, তবে কি সাক্ষী আনতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে?’ এরপরই এ আয়াত নাজিল হয়। (বুখারি, হাদিস : ৪৭৪৭)
এই আয়াত ইসলামের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট করে—
প্রথমত, ইসলাম মানুষের সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপবাদ দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ।
দ্বিতীয়ত, ইসলাম বাস্তবতাকেও অস্বীকার করেনি। পারিবারিক জীবনের জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ বিধান দিয়েছে।
তৃতীয়ত, এখানে মানুষের অন্তরকে আল্লাহভীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কারণ চারবার শপথ এবং পঞ্চমবার আল্লাহর লানত বা গজবকে নিজের ওপর ডেকে আনা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি মিথ্যাবাদীকে ভীত করে এবং সত্যবাদীকে দৃঢ় রাখে।
তাফসিরবিদ ইমাম ইবন কাসির (রহ.) বলেন, এই বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমত। কারণ এর মাধ্যমে একদিকে মিথ্যা অপবাদ বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে অসহায় স্বামীর জন্যও পথ খোলা রাখা হয়েছে। (তাফসির ইবন কাসির, সূরা আন-নূর, আয়াত ৬)
আজকের সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সন্দেহ, গুজব ও সম্পর্কের অবনতির যুগে এই আয়াত আমাদের বড় শিক্ষা দেয়। ইসলাম কখনো আবেগ, সন্দেহ বা ক্রোধের ভিত্তিতে কারও চরিত্রহননের অনুমতি দেয় না। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রমাণ, সততা এবং আল্লাহভীতি। পরিবারের মর্যাদা রক্ষা ও সমাজকে অপবাদ সংস্কৃতি থেকে বাঁচাতে এই আয়াত এক অনন্য দিকনির্দেশনা।




