কোরআন শ্রবণে মেলে হৃদয়ের প্রশান্তি

প্রতীকী ছবি
কোরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়, এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশিকা। এর প্রতিটি আয়াত মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করে, চিন্তাকে শুদ্ধ করে এবং জীবনকে আলোকিত করে। তাই কোরআন পাঠের পাশাপাশি মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করাও ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি ইবাদত। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, যখন কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন মনোযোগ দিয়ে তা শুনতে এবং নীরব থাকতে, যাতে তাঁর রহমত লাভ করা যায় (সুরা আরাফ, আয়াত : ২০৪)।
কোরআন শ্রবণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো আল্লাহর রহমত ও হিদায়াত। যে ব্যক্তি একাগ্রচিত্তে আল্লাহর বাণী শোনে এবং তা অনুসরণ করার চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখান (সুরা যুমার, আয়াত : ১৮)। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোরআনের বাণী শুনেই বহু মানুষের জীবন বদলে গেছে। এমনকি একদল জিন কোরআন শ্রবণ করে একে বিস্ময়কর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল যে এটি মানুষকে সরল পথের দিশা দেয় (সুরা জিন, আয়াত : ১-২)।
কোরআন শ্রবণ ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং সত্য উপলব্ধির শক্তি বৃদ্ধি করে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হলে মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায় (সুরা আনফাল, আয়াত : ২)। কোরআনের বাণী যখন অন্তরে প্রবেশ করে, তখন মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়, আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায় এবং পাপ থেকে ফিরে আসার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। অনেক সময় একটি আয়াতই মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের ক্ষেত্রেও কোরআন শ্রবণের গুরুত্ব অপরিসীম। মনোযোগ দিয়ে শোনা মানুষের উপলব্ধি ও চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে। তবে আরবি ভাষা না জানা মানুষের জন্য অনুবাদ ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরসহ কোরআন শ্রবণ করলে এর শিক্ষা আরও গভীরভাবে হৃদয়ে পৌঁছে এবং জীবনের নানা সমস্যার সমাধানের পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কোরআন তিলাওয়াত শোনা এমন একটি ইবাদত, যা পালন করা অত্যন্ত সহজ। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে ঘরে, কর্মস্থলে কিংবা ভ্রমণের সময়ও মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে কোরআন শ্রবণ করা সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও সাহাবিদের তিলাওয়াত শুনতে ভালোবাসতেন-
আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কোরআন পাঠ কর। আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার কাছে কোরআন পাঠ করব? অথচ তা তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর আমি ’সুরা নিসা’ পাঠ করলাম। যখন আমি এই আয়াত পর্যন্ত আসলাম ’চিন্তা করো আমি যখন প্রত্যেক উম্মাতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং সকলের ওপরে তোমাকে সাক্ষী হিসাবে হাজির করব তখন তারা কী করবে।’ নবী (সা.) বললেন, আপাততঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি তার চেহারার দিকে তাকালাম, দেখলাম, তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। (বুখারি, হাদিস : ৫০৫০)
হিাদিসের এই ঘটনা কোরআন শ্রবণের গুরুত্ব ও সুন্নত হওয়ার প্রমাণ বহন করে ।
কোরআনের সান্নিধ্য মানুষের অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যারা একত্রিত হয়ে কোরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন করে, তাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল হয়, রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে এবং ফেরেশতারা তাদের পরিবেষ্টন করেন (মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)।
উদ্বেগ, অস্থিরতা ও মানসিক চাপে ভরা পৃথিবীতে কোরআনের সুমধুর তিলাওয়াত হতে পারে হৃদয়ের প্রশান্তির এক অনন্য উৎস। তাই প্রতিদিন কিছু সময় মনোযোগ দিয়ে কোরআন শ্রবণের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কারণ কোরআনের বাণী কেবল কানে পৌঁছায় না, তা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে নেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com



