যে তিন শ্রেণির মানুষ আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত

প্রতীকী ছবি
কিয়ামতের দিন হবে ন্যায়বিচারের দিন। সেদিন মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হবে মহান আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি লাভ করা। পক্ষান্তরে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভাগ্য হবে আল্লাহর অসন্তুষ্টির সম্মুখীন হওয়া। হাদিস গ্রন্থগুলোতে দেখা যায়; রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন তিন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। হাদিসটি হচ্ছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ثَلاَثَةٌ لاَ يُكَلِّمُهُمْ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلاَ يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ رَجُلٌ حَلَفَ عَلَى سِلْعَةٍ لَقَدْ أَعْطَى بِهَا أَكْثَرَ مِمَّا أَعْطَى وَهُوَ كَاذِبٌ وَرَجُلٌ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ كَاذِبَةٍ بَعْدَ الْعَصْرِ لِيَقْتَطِعَ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ وَرَجُلٌ مَنَعَ فَضْلَ مَاءٍ فَيَقُولُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْيَوْمَ أَمْنَعُكَ فَضْلِي كَمَا مَنَعْتَ فَضْلَ مَا لَمْ تَعْمَلْ يَدَاكَ
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, তিন রকমের মানুষ, যাদের সঙ্গে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না। (১) যে লোক তার মালের উপর এ মিথ্যা কসম করে যে, একে এখন যে মূল্যে বিক্রি করা হলো এর চেয়ে অধিক মূল্যে তা বিক্রয় করা যাচ্ছিল। (২) যে লোক কোনো মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করার জন্য ’আসরের সালাতের পর মিথ্যা শপথ করে। (৩) এক লোক সে, যে প্রয়োজনের বেশি পানি আটকিয়ে রাখে। আল্লাহ্ তাকে উদ্দেশ্য করে কিয়ামতের দিন বলবেন, আজ আমি আমার অনুগ্রহ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করব, যেমনি তুমি সেই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করতে যা তোমার হাতে অর্জিত নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪৪৬)
হাদিসের ভাষ্যমতে প্রথম ব্যক্তি হচ্ছে, সেই ব্যবসায়ী যে নিজের পণ্য বিক্রির জন্য মিথ্যা শপথ করে। সে ক্রেতাকে বিশ্বাস করাতে বলে, ‘আমি এর চেয়ে বেশি দাম পেয়েছিলাম’ অথবা ‘আমি এত দামেই কিনেছি’, অথচ বাস্তবে তা সত্য নয়। ইসলামে ব্যবসা ইবাদতের অংশ, কিন্তু প্রতারণা ও মিথ্যা শপথ সেই ইবাদতকে গুনাহে পরিণত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মিথ্যা শপথ পণ্য বিক্রি করায় সাহায্য করলেও তা বরকত নষ্ট করে দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৮৭; মুসলিম, হাদিস : ১৬০৬) বর্তমান সময়ে অনলাইন ও অফলাইন ব্যবসায় অতিরঞ্জিত দাবি, ভুয়া মূল্য এবং মিথ্যা শপথের প্রবণতা এই হাদিসের সতর্কবার্তাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
দ্বিতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা শপথ করে। হাদিসে বিশেষভাবে আসরের নামাজের পর শপথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সে সময় মানুষ শপথকে অধিক গুরুত্ব দিত। এখানে মূল শিক্ষা হলো, আদালত, জমিজমা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক বিরোধে মিথ্যা শপথ করে অন্যের হক দখল করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)
তৃতীয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি আটকে রাখে। ইসলামে পানি আল্লাহর দেওয়া এমন একটি নিয়ামত, যার ওপর মানুষের মৌলিক অধিকার রয়েছে। কেউ যদি নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে পানি আটকে রাখে, তবে সে মানবতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়। তাই আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে বলবেন, ‘আজ আমি আমার অনুগ্রহ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করব, যেমন তুমি এমন একটি নিয়ামত থেকে মানুষকে বঞ্চিত করেছিলে, যা তোমার নিজস্ব সৃষ্টি ছিল না।’ (বুখারি, হাদিস : ৭৪৪৬)
এই হাদিস কেবল তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং ইসলামের তিনটি মৌলিক নীতির শিক্ষা। এক. লেনদেনে সততা বজায় রাখা। দুই. অন্যের অধিকার কখনো অন্যায়ভাবে গ্রাস না করা। তিন. আল্লাহর দেওয়া জনকল্যাণমূলক সম্পদে মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
আজকের সমাজে ভেজাল, প্রতারণা, মিথ্যা প্রচারণা, জাল কাগজপত্র, ভূমি দখল, পানিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। একজন মুমিনের উচিত প্রতিটি লেনদেনে সত্যবাদিতা অবলম্বন করা, অন্যের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকা এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা। কারণ কিয়ামতের দিন মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ওপর। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকা, যা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে।
লেখক: শিক্ষিকা, এবিসি, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, নারায়ণগঞ্জ।




