নফল ইবাদতে কি ফরজের ঘাটতি পূরণ হবে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কিয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে। সালাত যথাযথ হলে বান্দা সফল হবে, আর তাতে ত্রুটি থাকলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপর ফরজ সালাতে কোনো ঘাটতি পাওয়া গেলে দেখা হবে তার নফল সালাত আছে কি না। নফল সালাত থাকলে তা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৮৬৪; তিরমিজি, হাদিস : ৪১৩; ইবন মাজাহ, হাদিস : ১৪২৫)
হাদিসটি সামনে রেখে প্রশ্ন জাগতে পারে, নফল ইবাদত দিয়ে কি ফরজের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়? তাহলে কেউ ফরজ নামাজে অবহেলা করে নফল নামাজ, দান-সদকা কিংবা অন্য নেক আমল বেশি করলেই কি তার ফরজের ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে? হাদিসটির সঠিক মর্ম বুঝতে হলে ‘ফরজে ঘাটতি’ এবং ‘ফরজ ছেড়ে দেওয়া’কে আলাদা কর বুঝতে হবে।
আবু হুরাইরা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে মূলত বলা হয়েছে, বান্দা ফরজ সালাত আদায় করার পরও তাতে কোনো ঘাটতি বা ত্রুটি থাকলে তার নফল সালাত সেই ঘাটতি পূরণের কারণ হতে পারে। এখানে ফরজ সালাত একেবারেই আদায় না করার কথা বলা হয়নি। তাই হাদিসটি ফরজ ছেড়ে দেওয়ার কোনো অনুমতি দেয় না।
ইসলামে ফরজ ও নফলের অবস্থানও আলাদা। ফরজ হলো অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ের ফরজ।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০৩) অন্যদিকে নফল হলো ফরজের অতিরিক্ত ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমার বান্দা আমার নৈকট্য অর্জনের জন্য যেসব আমল করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো সেই আমলগুলো যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি। এরপর সে নফল আমলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৫০২)
অতএব নফল ফরজের বিকল্প নয়। কেউ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ছেড়ে দিয়ে তাহাজ্জুদ, ইশরাক বা অন্য নফল নামাজ পড়লে তার ফরজের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে না। একইভাবে ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে দান-সদকা করলেও সেই দান নামাজের বিকল্প হবে না। কারণ একটি ফরজের পরিবর্তে অন্য কোনো নেক আমলকে বসিয়ে দেওয়ার বিধান শরিয়তে নেই।
তবে হাদিসটি মুমিনের জন্য আশারও একটি বার্তা বহন করে। মানুষ যত সতর্কই হোক, তার ইবাদতে ত্রুটি থেকে যেতে পারে। ফরজ সালাত আদায় করলেও একাগ্রতা, সুন্নত-আদব কিংবা আমলের পূর্ণতার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকতে পারে। এক্ষেত্রে নফল সালাত আল্লাহর রহমতে সেই ঘাটতি পূরণের কারণ হতে পারে। এ কারণেই ফরজের পাশাপাশি সুন্নত ও নফল সালাতের প্রতিও যত্নবান হওয়া জরুরি।
ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত ত্যাগ করা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮২) সালাত ত্যাগকারীর হুকুম নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সবাই একমত যে, ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
সুতরাং হাদিসটির শিক্ষা হলো— নফল ইবাদত ফরজের বিকল্প নয়; তবে ফরজ ইবাদতে থাকা ঘাটতি পূরণের কারণ হতে পারে। তাই ফরজকে অবহেলা করে নফলের ওপর নির্ভর করা নয়, বরং আগে ফরজকে যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে নিজের আমলকে পূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিয়ামতের দিন এই নফল আমলই হয়তো আল্লাহর রহমতে ফরজের কিছু ঘাটতি পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠবে।



