হাদিসের কথা
দুর্যোগে সহমর্মিতাই মুমিনের পরিচয়

প্রতীকী ছবি
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস কিংবা অন্য কোনো জাতীয় দুর্যোগে মানুষের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। কেউ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই থেমে যায়, আবার কেউ নিজের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ইসলামের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষই মুমিনের আদর্শের কাছাকাছি। কারণ ইসলাম ঈমানকে কেবল নামাজ, রোজা বা ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাকেও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২) এই আয়াত দুর্যোগ ও সংকটের সময় মুসলমানের করণীয়ও নির্ধারণ করে দিয়েছে। যখন কোনো অঞ্চলের মানুষ বন্যায় খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার সংকটে পড়ে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের উপকারকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯) এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয়, অন্যের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি এমন একটি আমল, যার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ নিজেই বান্দার সাহায্যকারী হয়ে যান।
অনেকেই মনে করেন, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানেই বড় অঙ্কের অর্থ দান করা। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সহযোগিতার পরিধি অনেক বিস্তৃত। যার অর্থ আছে, তিনি অর্থ দিয়ে সাহায্য করবেন। যার অর্থ নেই, তিনি নিজের শ্রম, সময় ও দক্ষতা দিয়ে মানুষের উপকার করতে পারেন। বন্যাকবলিত এলাকায় আশ্রয়হীন মানুষকে নিজের ঘরে আশ্রয় দেওয়া, রান্না করে খাবার পৌঁছে দেওয়া, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, অসুস্থ ও বৃদ্ধদের হাসপাতালে নেওয়া, উদ্ধারকাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নেওয়া, রক্তের প্রয়োজন হলে রক্তদান করা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম সহজ করা, সবই মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত। এমনকি আন্তরিক দোয়া এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের মনোবল বাড়ানোও ইসলামে মূল্যবান আমল।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩২) যদিও আয়াতটি বিশেষ একটি প্রসঙ্গে অবতীর্ণ, তবুও ইসলামী মুফাসসিররা এর মাধ্যমে মানবজীবনের মর্যাদা ও জীবন রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাই উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া, চিকিৎসাসেবা দেওয়া কিংবা নিরাপদ স্থানে মানুষকে পৌঁছে দেওয়াও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।
দুর্যোগের সময় কাউকে সাহায্য করতে গেলে সেখানেও ইসলাম কিছু আদব শিখেয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ইসলাম দানকে লোক দেখানোর মাধ্যম বানাতে নিরুৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান নষ্ট করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪) তাই ত্রাণ দেওয়ার সময় অসহায় মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তাদের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা, অপমানজনক আচরণ করা বা সাহায্যকে আত্মপ্রচারের উপায় বানানো ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একই সঙ্গে দুর্যোগের সময়ে গুজব ছড়ানো, খাদ্য বা ওষুধ মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা এবং অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। একজন মুমিন মানুষের বিপদকে কখনো ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ হিসেবে দেখেন না; বরং সংকটকে ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় অসংখ্য মানুষ সীমাহীন কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকের ঘর নেই, খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। এই বাস্তবতায় আমাদের প্রত্যেকের নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমি কীভাবে তাদের উপকারে আসতে পারি? হয়তো সামান্য একটি খাবারের প্যাকেট, একটি ওষুধ, একটি নৌকা, কয়েক ঘণ্টার স্বেচ্ছাসেবা বা একটি আন্তরিক দোয়াও কারও জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘মুমিনগণ পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো দেহ জেগে থাকে এবং কষ্ট অনুভব করে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১১)
এই হাদিসই আমাদের শিক্ষা দেয়, একজন মুসলমান কখনো অন্যের কষ্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পারেন না। তাই জাতীয় দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ঈমানেরও প্রকাশ। একজন মুমিনের পরিচয় শুধু তার ইবাদতে নয়, বরং বিপদে মানুষের হাত ধরে দাঁড়ানোর মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




