দিন-রাত: আল্লাহর কুদরতের অনন্য নিদর্শন

প্রতীকী ছবি
দিনের আলোয় পৃথিবী যখন জেগে ওঠে, মানুষ
কর্মচঞ্চল হয়ে ছুটে চলে জীবনের প্রয়োজনে; আবার সন্ধ্যা নামতেই ধীরে ধীরে নীরবতার
চাদরে ঢেকে যায় প্রকৃতি। এভাবে প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর
পরিবর্তন। আমরা অভ্যস্ত বলে হয়তো বিস্মিত হই না, কিন্তু একটু থেমে ভাবলেই বোঝা যায়, দিন ও রাতের
এই সুশৃঙ্খল আবর্তন কত গভীর অর্থ বহন করে। এটি শুধু সময়ের হিসাব নয়, বরং মহান
আল্লাহর অসীম জ্ঞান,
প্রজ্ঞা ও কুদরতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। কোরআন মানুষকে এই পরিচিত দৃশ্যের
মধ্যেই অচেনা সত্য খুঁজে দেখতে এবং সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি
করতে আহ্বান জানিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বারবার দিন-রাতের এই ব্যবস্থাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নিজেকে এভাবেই পরিচয় করিয়েছেন—
وَ هُوَ الَّذِیْ خَلَقَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ وَ الشَّمْسَ وَ الْقَمَرَ
‘তিনি সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৩)
রাত-দিনের বিরতিহীন আবর্তনের মধ্যেই আছে জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ—
اِنَّ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّیْلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الْاَلْبَابِ.
‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত-দিনের আবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)
কোরআনের কোথাও বলা হয়েছে—এসব নিদর্শন বুদ্ধিমানদের জন্য; কোথাও বলা হয়েছে—মুত্তাকীদের জন্য। অর্থাৎ যারা চিন্তা করে, যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারাই এই দিন-রাতের ব্যবস্থায় প্রভুর পরিচয় খুঁজে পাবে এবং বিনম্র কৃতজ্ঞতায় সিজদায় লুটিয়ে পড়বে।
কিছু আয়াতে রাত ও দিনের রূপান্তর বর্ণনা করে আল্লাহর কুদরতের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে—
تُوْلِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَ تُوْلِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ
‘আপনি রাতকে দিনে প্রবেশ করান, আর দিনকে প্রবেশ করান রাতে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৭)
গ্রীষ্মে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে, শীতে কমে; আবার রাতের ক্ষেত্রেও উল্টোটা ঘটে। এক অংশ দিন ঢুকে যায় রাতের মধ্যে, রাত ঢুকে পড়ে দিনের মধ্যে। এগুলোই মহান আল্লাহর নির্ধারিত চক্র।
অন্য আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে—
يُغْشِي الَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهٗ حَثِيْثًا
‘তিনি দিনকে ঢেকে দেন রাত দিয়ে, রাত দ্রুতগতিতে দিনের পেছনে চলে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৫৪)
দিন-রাত একই সময চক্র অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হলেও আল্লাহ তায়ালা সময়ের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন কাজের উপযোগিতা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
রাতকে বানিয়েছেন বিশ্রামের জন্য, দিনকে কর্মের জন্য—
هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ لِتَسْكُنُوْا فِيْهِ وَ النَّهَارَ مُبْصِرًا اِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَاٰيٰتٍ لِّقَوْمٍ يَّسْمَعُوْنَ.
‘তিনি তোমাদের জন্য রাত সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে বিশ্রাম গ্রহণ কর এবং দিনকে করেছেন আলোয় উজ্জ্বল।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৬৭)
وَ هُوَ الَّذِيْ جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ لِبَاسًا وَّ النَّوْمَ سُبَاتًا وَّ جَعَلَ النَّهَارَ نُشُوْرًا
‘তিনি রাতকে বানিয়েছেন পোশাকস্বরূপ, ঘুমকে বিশ্রাম, আর দিনকে জাগরণের সময়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭)
রাতের ঘুমের প্রশান্তি দিনের সমস্ত ক্লান্তি মুছে দেয়, আর দিনের আলোতে কর্ম-উদ্যম প্রস্ফুটিত হয়।
আল্লাহ তায়ালা সুরা কাসাসে প্রশ্ন ছুড়ে বলেছেন—
قُلْ اَرَءَيْتُمْ اِنْ جَعَلَ اللهُ عَلَيْكُمُ الَّيْلَ سَرْمَدًا اِلٰي يَوْمِ الْقِيٰمَةِ مَنْ اِلٰهٌ غَيْرُ اللهِ يَاْتِيْكُمْ بِضِيَآءٍ...
‘তুমি বলো, যদি আল্লাহ তোমাদের ওপর রাতকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ছাড়া আর কে তোমাদের আলো এনে দিতে পারে?’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৭১)
‘আর যদি দিন হয়ে যায় চিরস্থায়ী, তবে আল্লাহ ছাড়া আর কে তোমাদের বিশ্রামের জন্য রাত এনে দিতে পারে?’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৭২)
এরপরই তিনি বলেছেন—
وَ مِنْ رَّحْمَتِهٖ جَعَلَ لَكُمُ الَّيْلَ وَ النَّهَارَ لِتَسْكُنُوْا فِيْهِ وَ لِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٖ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ
‘আপন মেহেরবানিতেই তিনি তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন—রাতে বিশ্রাম, দিনে তাঁর অনুগ্রহ অন্বেষণ, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৭৩)
দিনের আলো শুধু কাজের নয়, জীবনের জন্যও অপরিহার্য—সূর্যালোক আমাদের দেয় ভিটামিন ডি, সূর্যালোকেই হয় ফল-ফসলের বৃদ্ধি, সাধিত হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য।
সর্বোপরি, কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
سَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهارَ
‘তিনি তোমাদের কল্যাণে রাত ও দিনকে নিয়োজিত রেখেছেন।’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত ৩৩)
রাত ও দিনের এই পরিবর্তন মানুষের জীবন ও কর্মকে সুশৃঙ্খল করে, বিশ্রাম ও ইবাদতের সুযোগ দেয় এবং আল্লাহর মহিমা ও ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে কাজ করে।
তাই দিন-রাতের এই নিরবচ্ছিন্ন আবর্তন নিছক সময়ের পরিবর্তন নয়; এটি প্রতিদিনের এক নীরব আহ্বান। রাত আমাদের শেখায় থামতে, বিশ্রাম নিতে ও নির্জনে প্রভুর কাছে ফিরে যেতে; দিন শেখায় জেগে উঠতে, দায়িত্ব পালন করতে ও তাঁর দেওয়া নেয়ামতের সন্ধান করতে।
অথচ আমরা কত সহজেই এই মহৎ নিদর্শনগুলোর পাশ দিয়ে উদাসীনভাবে চলে যাই! একটু গভীরভাবে তাকালেই দেখা যায়, প্রতিটি ভোর যেন নতুন করে আল্লাহর কুদরতের সাক্ষ্য দেয়, আর প্রতিটি রাত আমাদের হৃদয়কে তাঁর মহিমার দিকে ফিরিয়ে নেয়।
তাই দিন-রাতের এই পরিবর্তন দেখে মুমিনের হৃদয়ে শুধু বিস্ময় নয়, জেগে উঠুক কৃতজ্ঞতা, তাসবিহ ও আত্মজিজ্ঞাসাও। কারণ যে হৃদয় সৃষ্টির দৃশ্যের আড়ালে স্রষ্টাকে দেখতে শেখে, তার কাছে প্রতিটি ভোর একটি নতুন আয়াত, প্রতিটি রাত একটি নতুন শিক্ষা।
লেখক: তরুণ আলেম






