হাদিসের কথা
জান্নাতে মুমিনের তিন চিরস্থায়ী নিয়ামত

প্রতীকী ছবি
পৃথিবীর প্রতিটি সুখের সঙ্গে দুঃখ, প্রতিটি সৌন্দর্যের সঙ্গে ক্ষয় এবং প্রতিটি জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মানুষ যতই সম্পদ, খ্যাতি বা যৌবনের পেছনে ছুটুক না কেন, সময়ের প্রবাহ একদিন সবকিছুই কেড়ে নেয়। অথচ ইসলাম মানুষের সামনে এমন এক জীবনের সুসংবাদ দেয়, যেখানে সুখে কোনো দুঃখের ছায়া নেই, সৌন্দর্যে নেই কোনো মলিনতা এবং যৌবনে নেই বার্ধক্যের স্পর্শ। এ কারণেই জান্নাতকে বলা হয়েছে চিরস্থায়ী শান্তি ও পরিপূর্ণ নিয়ামতের আবাস।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে জান্নাতের এমনই তিনটি অনন্য ও চিরস্থায়ী নিয়ামতের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,
«مَنْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ يَنْعَمُ لَا يَبْأَسُ، لَا تَبْلَى ثِيَابُهُ، وَلَا يَفْنَى شَبَابُهُ»
‘যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে চিরসুখে থাকবে, কখনো কোনো কষ্ট পাবে না। তার পোশাক কখনো জীর্ণ হবে না এবং তার যৌবন কখনো শেষ হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৬)
হাদিসে প্রথম যে নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে, তা হলো চিরস্থায়ী সুখ ও নিরাপত্তা। পৃথিবীতে কোনো সুখই স্থায়ী নয়। ধনী ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হন, ক্ষমতাবান মানুষও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। কিন্তু জান্নাত এমন এক আবাস, যেখানে কষ্ট, ভয় কিংবা বিষণ্নতার কোনো স্থান নেই। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে কখনো বেরও হবে না।’ (সুরা আল-হিজর, আয়াত : ৪৮)
দ্বিতীয় নিয়ামত হলো অক্ষয় সৌন্দর্য ও ক্ষয়হীন জীবনযাপন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তাদের পোশাক কখনো পুরনো হবে না।’ এটি শুধু পোশাকের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং জান্নাতের প্রতিটি নিয়ামতের স্থায়িত্বের প্রতীক। পৃথিবীর সব বস্তুই সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু জান্নাতে ক্ষয় বা পুরনো হওয়ার কোনো ধারণা নেই। আল্লাহ বলেছেন, ‘এটি আমাদের দেওয়া রিজিক, যা কখনো শেষ হবে না।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত : ৫৪)
তৃতীয় নিয়ামত হলো চিরস্থায়ী যৌবন। পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ করে হারিয়ে যাওয়া যৌবনের জন্য। অথচ জান্নাতে যৌবন কখনো শেষ হবে না। অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতিরা তেত্রিশ বছর বয়সী পূর্ণাঙ্গ যৌবনের অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫৪৫) সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, সেখানে ঘোষণা করা হবে, ‘তোমরা সর্বদা তরুণ থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৩৭)
এই তিনটি নিয়ামত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও আখিরাতের জীবন অনন্ত। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীর সাময়িক সৌন্দর্যের পেছনে জীবন ব্যয় না করে সেই চিরস্থায়ী জান্নাত অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘আখিরাতই উত্তম এবং অধিক স্থায়ী।’ (সুরা আল-আ'লা, আয়াত : ১৭)
জান্নাতের এই সুসংবাদ শুধু ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতি নয়; বরং বর্তমান জীবনে ইমান, তাকওয়া ও নেক আমলের পথে অবিচল থাকার এক শক্তিশালী প্রেরণা। কারণ যে জান্নাতের পথে চলবে, তার জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক জীবন, যেখানে সুখের অবসান নেই, সৌন্দর্যের ক্ষয় নেই এবং যৌবনেরও শেষ নেই।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জান্নাতের এসব নিয়ামত ভোগ করার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




