ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম কী? ইসলামে এর গুরুত্ব কতটুকু?

প্রতীকী ছবি
হিজরী বর্ষের রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’ নামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হতে দেখা যায়। বিশেষত সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখের অনুসারীদের মধ্যে এ অনুষ্ঠানটি বেশি প্রচলিত। এ উপলক্ষে কোথাও কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়, কোথাও মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। আবার কোনো কোনো স্থানে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও খাবার বিতরণেরও আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানটির সঙ্গে সাধারণত বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত দিবসের স্মরণকে যুক্ত করা হয়। তবে ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের প্রচলন, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে এর মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করতে হলে কয়েকটি বিষয় পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষত, কোনো বুযুর্গ ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট দিনকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম আসলে কি
‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ এগারো। আর ‘ফাতেহা’ শব্দটি সাধারণত দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো আমল করা অথবা এ উপলক্ষে আয়োজিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অর্থে ব্যবহৃত হয়। সে হিসেবে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো তারিখের ফাতেহা বোঝানো হয়।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত স্মরণে এ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তিনি ইসলামের ইতিহাসে একজন প্রসিদ্ধ আলেম, সাধক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। তার ইলম, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং মানুষের নৈতিক সংশোধনে অবদানের কথা বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে আলোচিত হয়েছে।
তার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং তার জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ মুসলিমদের জন্য প্রশংসনীয় বিষয়। কিন্তু কোনো আলেম, সাধক বা বুযুর্গের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি অবশ্যই শরিয়তের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কোনো ব্যক্তির মর্যাদা যতই উঁচু হোক, তার স্মরণে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি প্রবর্তনের জন্য কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি থাকা আবশ্যক।
ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের ঐতিহাসিক ভিত্তি কতটুকু?
ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের সঙ্গে যে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়, তা হলো ১১ রবিউস সানি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর মৃত্যুদিবস কি না। প্রচলিত বিশ্বাসে দিনটিকে তার ওফাত দিবস হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ঐতিহাসিক সূত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তার ইন্তেকালের তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তার জীবনীগ্রন্থ ‘তাফরীহুল খাতির ফি মানাকিবিশ শায়খ আবদুল কাদির’-এ তার ইন্তেকালের তারিখ সম্পর্কে একাধিক মত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে রবিউস সানির ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৭ ও ১৮ তারিখের কথা পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় রবিউল আউয়াল মাসের ১০ তারিখের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত গ্রন্থে বিভিন্ন মতের মধ্যে রবিউস সানির ১০ তারিখকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। (দেখুন: ফাতাওয়া রহিমিয়া, ২/৭৬–৭৭)
এ ছাড়া প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ আল্লামা শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি (রহ.) তার তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন:
توفي في عاشر ربيع الآخر سنة إحدى وستين، وله تسعون سنة
‘তিনি ৫৬১ হিজরির রবিউস সানি মাসের ১০ তারিখে ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।’ (তারিখুল ইসলাম, ২৯/৬০)
উপরিউক্ত তথ্য থেকে বোঝা যায়, ১১ রবিউস সানিকে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর নিশ্চিত মৃত্যুদিবস হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সংশয় রয়েছে। অবশ্য কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেই তার প্রতি শ্রদ্ধা বা তার জীবনী আলোচনা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। তবে একটি নির্দিষ্ট তারিখকে তার ওফাত দিবস হিসেবে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ করতে হলে তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ও শরিয়তসম্মত প্রমাণ উভয়ই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস পালনের শরয়ি ভিত্তি
ইসলামে আল্লাহর ইবাদত, ধর্মীয় উৎসব এবং বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা মৌলিক ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে, খোলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলে কোনো নবী, রাসুল, সাহাবি বা বুযুর্গের জন্মদিবস কিংবা মৃত্যুদিবসকে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন প্রবর্তন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস : ১৭১৮)
আরেক বর্ণনায় তিনি বলেছেন: ‘প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮৬৭)
এই হাদিসগুলো থেকে আলেমরা বুঝিয়েছেন, দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ইবাদত বা ধর্মীয় রীতি চালু করার ক্ষেত্রে শরিয়তের অনুমোদন থাকা জরুরি। কোনো কাজ সাধারণভাবে ভালো মনে হলেও সেটিকে নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আলাদা দলিল প্রয়োজন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: কোনো বুযুর্গের জীবনী আলোচনা করা, তার নেক আমলের কথা স্মরণ করা কিংবা তার জন্য দোয়া করা এক বিষয়; আর তার জন্ম বা মৃত্যুর দিনকে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করা অন্য বিষয়। এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা শরিয়তের আলোচনাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ঈসালে সওয়াবের শরয়ী উপায়
ইসলাম মৃত মুসলিমদের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও সদকার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে ঈমান নিয়ে চলে যাওয়া ভাইদের ক্ষমা করুন।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ১০)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ইসলামের স্বীকৃত আমল। অনুরূপভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য সদকা করা, তার ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করা এবং তার কল্যাণের জন্য দোয়া করা নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জন্য দোয়া করা, তার জীবনী পাঠ করা, তার ইলম ও তাকওয়া থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তার নামে সদকা করা বৈধ নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু এসব আমল করার জন্য রবিউস সানির ১১ তারিখকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ দিন মনে করার প্রয়োজন নেই।
বরং বছরের যেকোনো দিন তার জীবনী আলোচনা করা যায়, তার শিক্ষাকে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায় এবং তার জন্য দোয়া করা যায়। নেককার বুযুর্গদের প্রকৃত সম্মান হলো তাদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা, তাদের উপদেশ অনুযায়ী নিজেকে সংশোধন করা এবং সমাজে কল্যাণকর কাজ করা।
সুতরাং হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত পথ হলো তার জীবন ও শিক্ষার আলোকে নিজেকে সংশোধন করা, সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং সমাজে ন্যায়, সততা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। কোনো নির্দিষ্ট দিবসের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে এই আদর্শই একজন বুযুর্গের স্মৃতির প্রতি অধিক ফলপ্রসূ সম্মান প্রদর্শন করতে পারে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ওসাংবাদিক



