হজ মানুষের জীবনে যেসব পরিবর্তন আনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের জীবনে কিছু সফর থাকে, যা কেবল স্থান পরিবর্তন নয়; বরং আত্মার গভীরে এক বৈপ্লবিক রূপান্তরের সূচনা করে। হজ তেমনই এক মহান সফর ও ইবাদত। এটি শুধু মক্কা-মদিনা সফর নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা, আত্মসমর্পণ ও নতুন জীবনের অঙ্গীকারের এক মহাসম্মেলন। একজন মানুষ যখন ইহরামের সাদা কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি তোলে, তখন সে যেন দুনিয়ার সব অহংকার, ভেদাভেদ ও গুনাহের ভার ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর দরবারে এক বিনম্র বান্দায় পরিণত হয়।
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। কিন্তু এর প্রভাব কেবল একটি ফরজ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত হজ মানুষের চিন্তা, চরিত্র, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধকে বদলে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৫০)
এই হাদিস হজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের দিকটি তুলে ধরে। হজ মানুষকে গুনাহমুক্ত এক নতুন জীবনের সুযোগ দেয়। তাই আলেমরা বলেন, হজ শুধু একটি সফর নয়; এটি জীবনের নতুন জন্ম।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন-এ লিখেছেন, হজের প্রতিটি আমলের ভেতরে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা। কাবা তাওয়াফ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, মুমিনের জীবনের কেন্দ্র হতে হবে আল্লাহ। সাফা-মারওয়ার সায়ি শেখায় চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের সমন্বয়। আর আরাফার ময়দান মানুষকে কিয়ামতের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে সবাই একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে।
হজ মানুষের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হজের সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৭)
তাকওয়া মানুষের জীবনকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। যে ব্যক্তি হজ থেকে ফিরে এসে নামাজে যত্নবান হয়, হারাম থেকে বেঁচে থাকে, মানুষের হক আদায়ে সচেতন হয় এবং দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলে, তার মধ্যেই হজের প্রকৃত প্রভাব ফুটে ওঠে।
হজ মানুষকে বিনয় শেখায়। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো, আরব-অনারব সবাই একই পোশাকে, একই ময়দানে, একই রবের সামনে দাঁড়ায়। সেখানে পদ-পদবি বা জাতিগত অহংকারের কোনো মূল্য নেই। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ায়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২৯৭৮)
আজকের বিভক্ত ও অহংকারপূর্ণ পৃথিবীতে হজ এই মহান মানবিক সমতার শিক্ষা দেয়।
হজ মানুষের হৃদয়ে আখিরাতের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। ইহরামের দুই টুকরো সাদা কাপড় কাফনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আরাফার ময়দানের লাখো মানুষের কান্না হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাই বহু আলেম বলেছেন, হজ হলো মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর প্রস্তুতির বাস্তব অনুশীলন।
বিশিষ্ট আলেম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘হজ মানুষের আত্মাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। এটি হৃদয়ের কঠোরতা ভেঙে দেয় এবং বান্দাকে দুনিয়ার বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে।’ (যাদুল মাআদ, ২/৮৭)
হজ মানুষকে ধৈর্য ও সহনশীলতাও শেখায়। প্রচণ্ড ভিড়, কষ্ট, দীর্ঘ পথচলা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন হাজি ধৈর্য ধারণ করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। ‘হজের সময়ে অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ নেই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৭)
এ শিক্ষা যদি একজন হাজির জীবনে স্থায়ী হয়, তবে সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তির বাহক হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, অনেকেই হজ করে ফিরে এলেও জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেন না। কারণ হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মিক বিপ্লব। হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘কবুল হজের আলামত হলো, মানুষ হজ থেকে ফিরে এসে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হয় এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।’
আজ মুসলিম সমাজে হজের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু যদি হজ মানুষের চরিত্র, ব্যবসা, রাজনীতি, সামাজিক আচরণ ও নৈতিকতায় প্রভাব না ফেলে, তবে হজের প্রকৃত শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। একজন হাজির মুখে মিথ্যা মানায় না, তার হাতে দুর্নীতি মানায় না, তার হৃদয়ে হিংসা-অহংকার মানায় না।
হজ মানুষকে নতুন জীবন শুরু করার আহ্বান জানায়। এটি এমন এক ইবাদত, যা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং চূড়ান্ত গন্তব্য আল্লাহর কাছেই। তাই হজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, মানুষ আল্লাহমুখী হয়ে ওঠে। তার হৃদয়ে সৃষ্টি হয় তওবা, বিনয়, তাকওয়া ও মানবতার বোধ।
যে হজ মানুষের অন্তরকে বদলে দেয়, সেই হজই মকবুল হজ। আর মকবুল হজের প্রতিদান সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩; মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মকবুল হজের তাওফিক দান করুন।






