আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস
ইসলাম ও আধুনিক আইনের আলোকে শিশুশ্রম

সংগৃহীত ছবি
আজ আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু এখনো এমন কাজে নিয়োজিত, যা তাদের শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে এখনো কোটি সংখ্যক শিশু শ্রমে জড়িত, যার একটি বড় অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।
বাংলাদেশেও শিশুশ্রম দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তবতা। দারিদ্র্য, শিক্ষাব্যবস্থায় বিচ্যুতি, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক সচেতনতার অভাব এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুকে অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা হয় না; তাকে দেখা হয় আল্লাহর আমানত, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে।
শিশুশ্রম বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বুঝতে হলে প্রথমে ইসলামে শিশুর মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)
মুফাসসিরগণ বলেছেন, পরিবারকে রক্ষা করার অর্থ কেবল খাদ্য দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা, নৈতিকতা, চরিত্র ও সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
আবার আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ
‘দারিদ্র্যের আশঙ্কায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের ধ্বংস করো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩১)
যদিও আয়াতটি সরাসরি সন্তান হত্যা নিষিদ্ধ করেছে, অনেক সমকালীন ইসলামি চিন্তাবিদ এখানে একটি বৃহত্তর নীতি দেখিয়েছেন, তা হলো অর্থনৈতিক চাপের কারণে সন্তানের মৌলিক অধিকার নষ্ট করা ইসলাম সমর্থন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩; মুসলিম, হাদিস : ১৮২৯)
এ হাদিসে অভিভাবকের ওপর শিশুর নিরাপত্তা, লালন-পালন ও উন্নয়নের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে আরোপ করা হয়েছে।
ইসলামে শিশুশ্রমের বিধান কী
ইসলামী ফিকহে আধুনিক অর্থে সরাসরি ‘শিশুশ্রম’ নামে আলাদা অধ্যায় না থাকলেও শিশু, শ্রম, মজুরি, অভিভাবকত্ব এবং ক্ষতি প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। এসব নীতির সমন্বয় থেকে ইসলামী অবস্থান পরিষ্কার হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুকে বয়স, সক্ষমতা ও কল্যাণ বিবেচনা ছাড়া শ্রমে বাধ্য করা বৈধ নয়।
পবিত্র কোরআনের একটি মৌলিক নীতি হলো,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
‘আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৬)
এই নীতি মানুষের ওপর দায়িত্ব আরোপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ইমাম শাতিবি (রহ.) তাঁর আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে শরিয়তের উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, শরিয়তের অন্যতম লক্ষ্য হলো মানুষের জীবন, বুদ্ধি ও ভবিষ্যৎ কল্যাণ সংরক্ষণ। শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিকাশ নষ্ট করে এমন শ্রম এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন গ্রন্থে লিখেছেন, শরিয়তের ভিত্তি ন্যায়, কল্যাণ, রহমত ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে প্রয়োগ মানুষের কল্যাণ ধ্বংস করে, তা শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
এই নীতির আলোকে বলা যায়, এমন কাজ যা শিশুর শিক্ষা বন্ধ করে দেয়, শারীরিক ক্ষতি করে, শোষণ সৃষ্টি করে বা তাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঠেলে দেয়, তা ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিশু কি কোনো কাজ করতে পারবে না?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ইসলাম শিশুদের বয়সোপযোগী দায়িত্বশীলতা, পারিবারিক সহযোগিতা, দক্ষতা অর্জন ও হালকা কাজ শেখাকে নিরুৎসাহিত করেনি। সাহাবিদের জীবনে শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব জীবনচর্চার উদাহরণ আছে।
কিন্তু পরিবার বা ব্যবসার স্বার্থে শিশুর শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া, দীর্ঘ সময় শ্রমে নিয়োজিত করা বা বিপজ্জনক কাজে বাধ্য করা ইসলাম সমর্থন করে না।
ইমাম গাজালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন-এ শিশু প্রতিপালনের আলোচনায় লিখেছেন, শিশু হলো আমানত; তার চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব অভিভাবকের।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম বিষয়ক আইন
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণে একাধিক আইন ও নীতি রয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী সাধারণভাবে ১৪ বছরের নিচে শিশুকে শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ।
১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, সময় ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে। সরকার ঝুঁকিপূর্ণ কাজের একটি তালিকা নির্ধারণ করেছে, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়োগ নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) এবং ILO Convention 138 ও Convention 182-এর সদস্য।
অন্যান্য দেশে শিশুশ্রম আইন
ভারতে Child and Adolescent Labour (Prohibition and Regulation) Act শিশুদের অনেক ধরনের শ্রম নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার বয়সসীমার মধ্যে পূর্ণকালীন শ্রম নিষিদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কঠোর শ্রমনীতি অনুসরণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা শিশুশ্রমকে এমন কাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যা শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
মুসলিম সমাজের করণীয়
শিশুশ্রম প্রতিরোধ শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বও। যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে মসজিদ, মাদরাসা, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
যাকাত, সদকা, ওয়াকফ ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হলে অনেক পরিবার শিশুদের শ্রমে পাঠানোর অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
শিশুকে হাতের কাজ শেখানো যেতে পারে, কিন্তু তার শৈশব কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। তাকে দায়িত্বশীল করা যেতে পারে, কিন্তু শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশু কোনো উৎপাদনযন্ত্র নয়; সে আল্লাহর দেওয়া আমানত। তার শিক্ষা, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ ও মর্যাদা সংরক্ষণ করা ইবাদতের অংশ। আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শিশুদের জন্য এমন সমাজ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে তাদের হাতে থাকবে বই, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কারণ আজকের শিশু শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়, বরং আগামী দিনের উম্মাহ ও মানবসমাজেরও নির্মাতা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




