যে মুসলিম বিজ্ঞানী পৃথিবীকে মেপেছিলেন

প্রতীকী ছবি
মানুষ আজ মহাকাশযান পাঠায় মঙ্গলগ্রহে, বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করে দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে। কিন্তু এমন এক সময় ছিল, যখন পৃথিবীর আকারই ছিল মানুষের কাছে রহস্য। পৃথিবী কত বড়, সূর্য ও চাঁদের অবস্থান কীভাবে নির্ণয় করা যায়, কিংবা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি কী নিয়মে চলে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মুসলিম বিশ্বের একদল বিজ্ঞানী মধ্যযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু আল-আব্বাস আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন কাসির আল-ফারগানি, যিনি পাশ্চাত্যে আল-ফ্রাগানুস নামে পরিচিত।
আল-ফারগানির জন্ম বর্তমান উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তার জন্মসাল নিশ্চিতভাবে জানা না গেলৌ অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্ঞানকেন্দ্র। খলিফা আল-মামুন (শাসনকাল: ৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত বাইতুল হিকমাহতে গ্রিক, ভারতীয় ও পারস্যের জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও পরিচালিত হতো। আল-ফারগানি ছিলেন সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী।
পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের ঐতিহাসিক অভিযান
প্রচলিত ধারণার বিপরীতে পৃথিবীর পরিধি প্রথম নির্ণয় করেন গ্রিক বিজ্ঞানী এরাটোসথেনিস (খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী)। তবে তার পরিমাপের এককের ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। আব্বাসীয় যুগে খলিফা আল-মামুনের নির্দেশে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নতুনভাবে পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের উদ্যোগ নেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, আল-ফারগানি এই বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এর ফলাফল বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তারা সিরিয়া ও ইরাকের সমতল মরুভূমিতে এক ডিগ্রি অক্ষাংশের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করেন। এই গবেষণা থেকে পৃথিবীর পরিধির যে মান পাওয়া যায়, তা আধুনিক পরিমাপের খুব কাছাকাছি ছিল। আল-ফারগানি পরবর্তীকালে তার গ্রন্থে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ও পরিধি সম্পর্কে যে তথ্য দেন, তা মধ্যযুগের ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন জনপ্রিয় লেখায় তার পৃথিবীর ব্যাস ৬,৫০০ মাইল বলে উল্লেখ করা হলেও আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, তিনি মূলত পৃথিবীর পরিধি ও এক ডিগ্রি মেরিডিয়ানের দৈর্ঘ্য সম্পর্কিত পরিমাপ উপস্থাপন করেছিলেন। তাই ‘তিনি প্রথম পৃথিবীর ব্যাস ৬,৫০০ মাইল নির্ণয় করেছিলেন’ এই দাবিটি ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল নয়।
আল-ফারগানির সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব ফি জাওয়ামি ইলম আন-নুজুম ওয়া উসুল আল-হারাকাত আস-সামাওয়িয়্যা’। এটি টলেমির আলমাজেস্ট গ্রন্থের একটি সহজবোধ্য ও সংশোধিত উপস্থাপনা হলেও আল-ফারগানি এতে অনেক নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা যুক্ত করেছেন।
দ্বাদশ শতকে গ্রন্থটি লাতিন ভাষায় ‘এলিমেন্টস অব অ্যাস্ট্রোনমি’ নামে অনুদিত হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম পাঠ্যগ্রন্থ। ইতালীয় কবি দান্তে আলিগিয়েরি তার বিখ্যাত ডিভাইন কমেডি গ্রন্থে আল-ফারগানির জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রভাব গ্রহণ করেছিলেন বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
আল-ফারগানি সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলোর আপাত গতি, পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি, বিষুবরেখা, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ এবং আকাশীয় গোলকের বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার কাজ পরবর্তী মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বাত্তানি, আল-বিরুনি এবং নাসিরুদ্দিন তুসির গবেষণাকেও প্রভাবিত করে।
যদিও জনপ্রিয় কিছু লেখায় বলা হয়, তিনি সব গ্রহের ব্যাস এবং আন্তঃগ্রহীয় দূরত্ব নির্ভুলভাবে নির্ণয় করেছিলেন, আধুনিক ইতিহাসবিদরা এ দাবিকে অতিরঞ্জিত মনে করেন। তিনি টলেমীয় জ্যোতির্বিদ্যার কাঠামোর মধ্যে গ্রহগুলোর অবস্থান ও দূরত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, কিন্তু আধুনিক অর্থে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ করেননি।
আল-ফারগানি কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানীই ছিলেন না, একজন দক্ষ প্রকৌশলীও ছিলেন। মিসরের কায়রোর নিকটবর্তী রওদা দ্বীপে অবস্থিত বিখ্যাত নিলোমিটার নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজে তার তত্ত্বাবধানের কথা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। নীল নদের পানির উচ্চতা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত এই স্থাপনাটি কৃষি, কর নির্ধারণ এবং বন্যা ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অনেক জনপ্রিয় লেখায় নিলোমিটারকে টাইগ্রিস নদী থেকে পানি আনার খাল প্রকল্পের অংশ বলা হলেও এটি সঠিক নয়। নিলোমিটার মূলত নীল নদের পানির স্তর পরিমাপের একটি বৈজ্ঞানিক স্থাপনা।
আল-ফারগানির রচনা শুধু আরবি ভাষাভাষী বিশ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার বই লাতিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর ইউরোপে বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আকাশ সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছিলেন, তার বড় একটি অংশ এসেছে মুসলিম বিজ্ঞানীদের রচনার মাধ্যমে। আল-ফারগানি সেই ধারার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি।
জ্ঞানচর্চার উজ্জ্বল প্রতীক
ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানচর্চা কখনো কেবল ধর্মীয় বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কুরআনের প্রথম ওহিই ছিল, ‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে।’ (সুরা আল-আলাক, আয়াত : ১)। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
আল-ফারগানির জীবন এই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃতি, মহাকাশ ও সৃষ্টিজগতের রহস্য অন্বেষণও ইবাদতেরই একটি অংশ হতে পারে, যদি তা মানবকল্যাণ ও সত্যের অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে হয়।
আল-ফারগানি এমন এক বিজ্ঞানী, যার অবদান শুধু মুসলিম সভ্যতার নয়, সমগ্র মানবজাতির জ্ঞানভান্ডারের অংশ। পৃথিবীর পরিমাপ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহজ পাঠ্য রচনা, প্রকৌশল দক্ষতা এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসারে তার অবদান মধ্যযুগের বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। আজ যখন বিজ্ঞানকে অনেক সময় শুধু আধুনিক বিশ্বের অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন আল-ফারগানির জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জ্ঞানচর্চার এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় মুসলিম মনীষীরাও ছিলেন পথপ্রদর্শক।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




