রাবেয়া বসরি আসলে কে ছিলেন?

প্রতীকী ছবি
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবনকে ঘিরে যেমন গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, তেমনি প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য ভিত্তিহীন কাহিনী। সময়ের প্রবাহে এসব গল্প এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, প্রকৃত ইতিহাস অনেক সময় আড়ালে পড়ে গেছে। তাবে-তাবিঈন যুগের প্রসিদ্ধ নারী রাবেয়া বসরী (রাহিমাহাল্লাহ) তাদেরই একজন। তাই তার সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র ও মুহাদ্দিসদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করাই অধিকতর নিরাপদ।
বিজ্ঞ আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাবেয়া আল-আদাবিয়া, যিনি ‘রাবেয়া বসরী’ নামে অধিক পরিচিত, হিজরি ১০০ সালে ইরাকের বসরা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮০ হিজরিতে প্রায় ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন তাবে-তাবিঈন যুগের একজন অনন্য পরহেজগার নারী। তার পরিচয় ছিল একজন যাহিদাহ (দুনিয়াবিমুখ), আবিদাহ (ইবাদতগুজার) এবং অত্যন্ত বিনয়ী বান্দাহ হিসেবে। সে সময় বর্তমানের মতো ‘তাসাউফ’ নামে কোনো স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠেনি; বরং কোরআন-সুন্নাহর অনুসরণে ইবাদত, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য কিছু মানুষ বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন। রাবেয়া বসরী ছিলেন তাদের অন্যতম।
সালাফে সালেহীনের বহু ইমাম তার প্রশংসা করেছেন। ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহি.) তার প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযী তার বিখ্যাত ‘সিফাতুস সাফওয়া’ গ্রন্থে রাবেয়ার জীবনী ও গুণাবলি সংকলন করেছেন। একইভাবে ইমাম আয-যাহাবী ‘সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ গ্রন্থে তাকে ‘অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার ও আল্লাহভীরু নারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, খণ্ড ৮, পৃ. ২৪১)
রাবেয়া বসরীর ইবাদতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল রাতব্যাপী তাহাজ্জুদ। তার সেবিকা আবদাহ বর্ণনা করেন, তিনি প্রায় পুরো রাত নামাজ আদায় করতেন। ফজরের আগে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে জেগে নিজেকে বলতেন, ‘হে নফস! আর কত ঘুমাবে? অচিরেই তুমি এমন এক ঘুমে (মৃত্যুতে) নিদ্রিত হবে, যেখান থেকে কেবল হাশরের দিনই জাগবে।’ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার এ অভ্যাস নিয়মিত ছিল। (সিফাতুস সাফওয়া, খণ্ড ৪; শযারাতুয যাহাব, খণ্ড ১)
পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তার নামে ‘হুলুল’ মতবাদ বা শরিয়তবিরোধী চিন্তা আরোপ করার চেষ্টা করলেও ইমাম আয-যাহাবী তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষায়, এসব অভিযোগ “অতিরঞ্জন ও মূর্খতা”; বরং ভ্রান্ত মতাবলম্বীরাই নিজেদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জন্য রাবেয়ার নামে এমন অপপ্রচার চালিয়েছে। (সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, খণ্ড ৮)
রাবেয়া বসরী থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো অলৌকিক কারামতের বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে তার বহু প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি সুফিয়ান আস-সাওরীকে বলেছিলেন, ‘তোমার জীবন তো অল্প কয়েকটি দিনের সমষ্টি। একটি দিন চলে গেলে তোমার জীবনেরও একটি অংশ চলে যায়। তাই যা জানো, সে অনুযায়ী আমল করো।’ (শযারাতুয যাহাব, খণ্ড ১)
তার আরেকটি গভীর আত্মসমালোচনামূলক উক্তি হলো, ‘আমি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার মধ্যেও আন্তরিকতার ঘাটতির জন্য আল্লাহর কাছে আবার ক্ষমা চাই।’
দুঃখজনক হলেও সত্য, ভারতীয় উপমহাদেশে তার নামে প্রচলিত বহু গল্প, যেমন হাতে আগুন ও পানি নিয়ে জান্নাত-জাহান্নাম পুড়িয়ে বা নিভিয়ে দেওয়ার কাহিনী, নির্ভরযোগ্য কোনো সনদে প্রমাণিত নয়। তাই রাবেয়া বসরীকে মূল্যায়ন করতে হলে লোকমুখে প্রচলিত কাহিনীর বদলে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইতিহাস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করাই উচিত। কারণ প্রকৃত ইতিহাসের রাবেয়া বসরী ছিলেন একজন মুত্তাকী, ইবাদতনিষ্ঠ ও প্রজ্ঞাবান নারী, যার জীবন আজও আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।




