কোরআনের বাণী
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় কোরআনের নির্দেশনা

কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২৬
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَدۡخُلُوۡا بُیُوۡتًا غَیۡرَ بُیُوۡتِكُمۡ حَتّٰی تَسۡتَاۡنِسُوۡا وَ تُسَلِّمُوۡا عَلٰۤی اَهۡلِهَا ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُوۡنَ
২৭. হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে তার অধিবাসীদের সম্প্ৰীতিসম্পন্ন অনুমতি না নিয়ে এবং তাদেরকে সালাম না করে প্ৰবেশ করে না। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।
এই আয়াতটি ইসলামের সামাজিক শিষ্টাচার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের এক অনন্য দলিল। ইসলাম শুধু ইবাদতের বিধান দেয়নি; বরং মানুষের ঘর, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের মর্যাদা রক্ষার জন্যও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
আয়াতে "حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا" শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এর অর্থ হলো অনুমতি চাওয়া এবং এমনভাবে আগমনের সংবাদ দেওয়া, যাতে ঘরের লোকেরা স্বস্তিবোধ করে। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, এখানে শুধু অনুমতি নেওয়াই উদ্দেশ্য নয়; বরং এমন আচরণ করা উদ্দেশ্য, যাতে গৃহস্থের মনে অস্বস্তি বা আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়। (তাফসির কুরতুবি)
জাহেলি যুগে মানুষ অনেক সময় হঠাৎ অন্যের ঘরে ঢুকে পড়ত। দরজা খোলা পেলেই প্রবেশ করত, ফলে ঘরের লোকেরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যেত। বিশেষত নারীদের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হতো। ইসলাম এসে এই অসভ্য রীতির অবসান ঘটায় এবং ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি ও সালামের বিধান প্রবর্তন করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّمَا جُعِلَ الِاسْتِئْذَانُ مِنْ أَجْلِ الْبَصَرِ
‘অনুমতি নেওয়ার বিধান দেওয়া হয়েছে দৃষ্টিকে সংযত রাখার জন্য।’ (বুখারি, হাদিস : ৬২৪১)
অর্থাৎ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করলে মানুষের এমন কিছু বিষয় চোখে পড়ে যেতে পারে, যা তারা অন্যের সামনে প্রকাশ করতে চায় না। তাই অনুমতি চাওয়া মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আয়াতে অনুমতির আগে সালামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সালাম শুধু একটি সম্ভাষণ নয়; এটি নিরাপত্তা, শুভকামনা ও আন্তরিকতার ঘোষণা। যখন কেউ বলে, ‘আসসালামু আলাইকুম’, তখন সে যেন জানিয়ে দেয়, ‘আমি তোমাদের জন্য শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছি; আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই।’
হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আমি কি প্রবেশ করব?’ নবী (সা.) তাকে শিখিয়ে দিলেন, আগে বলো:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ، أَأَدْخُلُ؟
‘আসসালামু আলাইকুম, আমি কি প্রবেশ করতে পারি?’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৭৭)
এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম একটি মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, আর তা হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার। আজকের যুগে যখন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, বার্তা কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার প্রবেশের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে, তখন সুরা নূরের এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি চাওয়ার বিধান শুধু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং কারও ব্যক্তিগত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য।
সুরা নুরের এই আয়াত আমাদের শেখায়, একজন মুসলমান শুধু নিজের ইবাদতের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি অন্যের গোপনীয়তা, সম্মান ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতিও সমান শ্রদ্ধাশীল হবে। অনুমতি চাওয়া ও সালাম দেওয়া কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ঈমানের সৌন্দর্য এবং ইসলামী সভ্যতার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন।




