সহীহ হাদীস বিশ্বকোষ: এক মলাটে হাদীসের বিশাল ভাণ্ডার
- হাদিসের জ্ঞানভাণ্ডারকে একসূত্রে বাঁধার প্রয়াস

ছবি: আগামীর সময়
হাদিস ইসলামী জ্ঞান ও জীবনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উৎস। কোরআনের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন মুসলিম জীবনের বিশ্বাস, ইবাদত, আচার-আচরণ ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ। কিন্তু হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকায় সাধারণ পাঠকের জন্য প্রয়োজনীয় হাদিস একসঙ্গে খুঁজে পড়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রয়োজনকে সামনে রেখে প্রকাশিত হয়েছে ‘সহীহ হাদিস বিশ্বকোষ’। বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসকে একটি বৃহৎ সংকলনের অধীনে নিয়ে আসার এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস।
বাংলা ভাষায় গ্রন্থটি মোট ১০ খণ্ডে সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম খণ্ডে রয়েছে ৭২০ পৃষ্ঠা এবং দ্বিতীয় খণ্ডে ৬৭২ পৃষ্ঠা। উভয় খণ্ডই হার্ডকাভারে প্রকাশিত। বাকি খণ্ডগুলো প্রকাশিত হলে এটি বাংলা ভাষায় হাদিসের অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত সংকলন হিসেবে পাঠকের সামনে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।
গ্রন্থটির মূল সংকলক প্রখ্যাত মুহাদ্দিস প্রফেসর ড. আবু আহমাদ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আ‘যামী (দ্বিয়াউর রহমান আ‘যামী)। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা মুনাওয়ারার হাদিস অনুষদের ডিন ও হাদিসের অধ্যাপক ছিলেন। মসজিদে নববীতেও তিনি শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘ হাদিস গবেষণাজীবনে তিনি হাদিসের বিপুল ভাণ্ডার নিয়ে কাজ করেন। ২০২০ সালে তিনি ইন্তিকাল করেছেন, তবে তার রেখে যাওয়া গবেষণা ও সংকলন আজও ইসলামি জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
‘সহীহ হাদিস বিশ্বকোষ’-এর পেছনে রয়েছে তার সুবৃহৎ হাদিস-সংকলন প্রকল্পের ইতিহাস। ড. দ্বিয়াউর রহমান আ‘যামী তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-জামে‘উল কামেল ফী হাদীসিস সহীহিশ শামিল’ রচনার সময় হাদিসের সনদ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। বিশালায়তনের কারণে সাধারণ পাঠকের জন্য গ্রন্থটি অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে উঠলে পরে এর সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রস্তুত করা হয়। ‘তালখীস আল-জামে‘ উল কামেল ফিল হাদিস আস-সহীহ আশ-শামেল’ নামের পাঁচ খণ্ডের সেই আরবি গ্রন্থের বাংলা রূপই ‘সহীহ হাদিস বিশ্বকোষ’।
বাংলা সংস্করণের অনুবাদ, সম্পাদনা ও টিকা সংযোজন করেছেন শাইখ প্রফেসর ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া। তিনি মূল সংকলক ড. দ্বিয়াউর রহমান আ‘যামীর সরাসরি ছাত্র ছিলেন। ফলে এই অনুবাদ ও সম্পাদনা কাজের সঙ্গে কেবল ভাষাগত দক্ষতাই নয়, মূল সংকলকের গবেষণাপদ্ধতি ও হাদিসচর্চার ধারার একটি প্রত্যক্ষ একাডেমিক সংযোগও রয়েছে। গ্রন্থটির বাংলা রূপায়ণে দেশের বিশিষ্ট ইসলামি স্কলারদের সমন্বয়ে গঠিত অনুবাদক প্যানেলও কাজ করছে। ফলে এত বড় একটি হাদিস-প্রকল্পকে বাংলায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও ভাষাগত দক্ষতার সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রন্থটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। সংকলকের নীতিমালা অনুযায়ী এমন কোনো হাদিস তিনি অন্তর্ভুক্ত করেননি, যেটিকে কোনো আলেমই বিশুদ্ধ বা গ্রহণযোগ্য বলেননি। এতে সহীহ ও হাসান উভয় ধরনের হাদিস স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ সহীহ লি-জাতিহি, সহীহ লিগাইরিহি, হাসান লি-জাতিহি ও হাসান লিগাইরিহি শ্রেণির হাদিসও সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
হাদিসের মান সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেওয়াও বইটির একটি বড় সুবিধা। হাদিস উদ্ধৃত করার পর তার হুকুম বা মান উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কোন কোন হাদিসগ্রন্থে সেটি বর্ণিত হয়েছে, তাও নির্দেশ করা হয়েছে। ফলে পাঠক শুধু হাদিসের বক্তব্যই পড়েন না, বরং হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা ও উৎস সম্পর্কেও ধারণা পান।
বিষয় বিন্যাসেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। অনেক ক্ষেত্রে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর সহিহ বুখারির অধ্যায় বিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয় সাজানো হয়েছে। আকিদা-সংক্রান্ত হাদিসের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কিত হাদিস হাদিসগ্রন্থের পাশাপাশি সনদসহ বর্ণিত আকিদার গ্রন্থ থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে আকিদার মৌলিক বিষয়গুলো হাদিসের আলোকে জানার একটি বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পুনরাবৃত্তি কমানোর চেষ্টা। একই হাদিস বিভিন্ন প্রসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের প্রয়োজন অনুযায়ী যতটুকু দরকার, ততটুকু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাদিসের কঠিন শব্দ ও পরিভাষার ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছে। কোরআনের তাফসির-সংক্রান্ত হাদিসগুলোও যথাসম্ভব একত্র করার চেষ্টা রয়েছে। সংকলক নিজেই হাদিসের সনদগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন, যা গ্রন্থটির গবেষণামূলক বৈশিষ্ট্যকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বাংলা সংস্করণের অন্যতম আকর্ষণ অনুবাদ ও টিকা। হাদিসের বক্তব্যকে সহজবোধ্য বাংলায় উপস্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানে ব্যাখ্যা ও টিকা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে গ্রন্থটি শুধু হাদিস পাঠের সংকলন হিসেবে নয়, হাদিসের বক্তব্য বুঝে পড়ার ক্ষেত্রেও সহায়ক।
সব মিলিয়ে ‘সহীহ হাদিস বিশ্বকোষ’ শুধু একটি বই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি বৃহৎ হাদিস-সংকলন প্রকল্প। ১০ খণ্ডে সমাপ্ত হওয়ার পরিকল্পিত এই সংকলনের প্রথম দুই খণ্ড ইতিমধ্যে পাঠকের হাতে এসেছে। একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের দীর্ঘ গবেষণার ফসল, তার সরাসরি ছাত্রের সম্পাদনা ও টিকা এবং দেশের বিশিষ্ট ইসলামি স্কলারদের সমন্বিত অনুবাদ প্রচেষ্টার কারণে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
হাদিসের বিভিন্ন মূল গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা সহীহ ও গ্রহণযোগ্য বর্ণনাগুলো বিষয়ভিত্তিকভাবে এক জায়গায় পড়তে চান এমন পাঠকের জন্য এটি হতে পারে একটি মূল্যবান সংকলন। বিশেষ করে ইসলামি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ইমাম-খতিব, লেখক, গবেষক এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ পাঠকের ব্যক্তিগত পাঠাগারে গ্রন্থটির স্থান হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। বাকি আট খণ্ড প্রকাশের মাধ্যমে প্রকল্পটি পূর্ণতা পেলে বাংলা ভাষায় হাদিসচর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



