কমেন্ট বক্সের ভাষা: ভিন্নমত প্রকাশের ইসলামী শিষ্টাচার

প্রতীকী ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষের মতপ্রকাশের জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো কমেন্ট বক্স। কোনো খবর, ছবি, মতামত বা ধর্মীয় বক্তব্য প্রকাশের পর মুহূর্তেই সেখানে নানা মন্তব্য জমতে থাকে। এক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ যখন অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপ, অপমান কিংবা গালাগালিতে রূপ নেয়, তখন শুধু অনলাইন পরিবেশই নষ্ট হয় না, সেখানে ব্যক্তির চরিত্র ও নৈতিকতারও প্রকাশ ঘটে। ইসলাম মতভেদকে নিষিদ্ধ করেনি; তবে মতভেদের মধ্যেও কথা বলার শিষ্টাচার নির্ধারণ করে দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তআলা বলেছেন-
وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا
‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)
এই নির্দেশ শুধু সামনাসামনি কথাবার্তার জন্য নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। কাজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখিত কথাও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই একটি মন্তব্য প্রকাশের আগে ভাবা প্রয়োজন, কথাটি কি সত্যিই প্রয়োজনীয়, উপকারী এবং শালীন?
মতভিন্ন ব্যক্তিকে অপমান বা বিদ্রূপ করাও ইসলামী নীতির পরিপন্থী। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
لَا یَسۡخَرۡ قَوۡمٌ مِّنۡ قَوۡمٍ عَسٰۤی اَنۡ یَّكُوۡنُوۡا خَیۡرًا مِّنۡهُمۡ
‘কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
একই আয়াতে একে অন্যকে দোষারোপ ও মন্দ নামে ডাকার ব্যাপারেও নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ কারও মতের বিরোধিতা করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে হেয় করার সুযোগ নেই।
ইসলাম বিতর্কের ক্ষেত্রেও সুন্দর পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّكَ بِالۡحِكۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَ جَادِلۡهُمۡ بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ
‘তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, সত্য তুলে ধরার উদ্দেশ্য থাকলেও ভাষা হতে হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও মার্জিত। কমেন্ট বক্সে কাউকে পরাস্ত করার চেয়ে সত্য ও কল্যাণের কথা তুলে ধরাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও ভয়াবহ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ جَآءَكُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا
‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াতক : ৬)
একটি ভুল মন্তব্য বা শেয়ার কারও সম্মানহানি, সামাজিক বিপদ কিংবা পারিবারিক সংকটের কারণ হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য করার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা খুবই জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
কমেন্ট বক্সের জন্য এর চেয়ে প্রাসঙ্গিক নৈতিক নির্দেশনা খুব কমই আছে। কোনো মন্তব্য যদি সত্য, প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর না হয়, সে ক্ষেত্রে নীরব থাকাও একজন মুমিনের উত্তম আচরণ হতে পারে।
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلاَ اللَّعَّانِ وَلاَ الْفَاحِشِ وَلاَ الْبَذِيءِ
‘মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
তাই ধর্মীয় মতভেদ, রাজনৈতিক মতভেদ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, কোনো ক্ষেত্রেই অশালীন ভাষাকে যুক্তির বিকল্প বানানো ইসলামী চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মতভেদ থাকতেই পারে। কেউ ভুলও করতে পারে। কিন্তু ভুল সংশোধনের ভাষাও হতে হবে সম্মানজনক। কমেন্ট বক্সে আমরা কী লিখছি, তা হয়তো কয়েক সেকেন্ডের কাজ; কিন্তু সেই শব্দ কারও মনে দীর্ঘদিনের ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই ‘আমি কীভাবে জবাব দেব?’ এ প্রশ্নের পাশাপাশি একজন মুসলমানের এটাও ভাবা উচিত যে, ‘আমার এই জবাব আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা?’
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। নববী আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



