হাদিসের কথা
যে স্বভাবের মানুষকে মহানবী (সা.) নিকৃষ্ট বলেছেন

প্রতীকী ছবি
মানুষকে অন্য সব সৃষ্টির থেকে আলাদা করেছে তার বিবেক, চিন্তাশক্তি এবং ভাষা। কথা মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে, আবার অনেক সময় সম্পর্ক নষ্টও করে। তাই ইসলাম মানুষের কথাবার্তার ধরনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أَحَبِّكُمْ إِلَىَّ وَأَقْرَبِكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَحَاسِنَكُمْ أَخْلاَقًا وَإِنَّ أَبْغَضَكُمْ إِلَىَّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الثَّرْثَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ وَالْمُتَفَيْهِقُونَ " . قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ عَلِمْنَا الثَّرْثَارُونَ وَالْمُتَشَدِّقُونَ فَمَا الْمُتَفَيْهِقُونَ قَالَ " الْمُتَكَبِّرُونَ "
‘তোমাদের যে ব্যক্তির চরিত্র ও আচরণ সর্বোত্তম তোমাদের মধ্যে সে-ই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং কিয়ামত দিবসেও সে আমার খুবই নিকটে থাকবে। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আমার নিকট সবচেয়ে বেশি ঘৃণ্য সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে আমার নিকট হতে অনেক দূরে থাকবে তারা হলো: বাচাল, ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং অহংকারে মত্ত ব্যক্তিরা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। বাচাল ও ধৃষ্ট-দাম্ভিকদের তো আমরা জানি কিন্তু মুতাফাইহিকূন কারা? তিনি বললেন, অহংকারীরা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২০১৮)
হাদিসটি আমাদের সমাজের একটি বাস্তব সমস্যা তুলে ধরেছে। আজকের যুগে মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞা কিংবা চরিত্রের চেয়ে অনেক সময় কথার চাকচিক্য বেশি মূল্য পায়। কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলেন, যেন অন্যদের কাছে নিজেকে বড় করে তুলে ধরাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ বক্তব্য, আত্মপ্রশংসা, অন্যকে ছোট করে কথা বলা কিংবা জটিল ভাষার মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা সমাজে ক্রমেই বাড়ছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ধরনের মানুষকে উম্মতের নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কারণ অতিরিক্ত ও অহংকারপূর্ণ কথাবার্তা মানুষের অন্তরের রোগের পরিচয় বহন করে। যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, মর্যাদা বা অবস্থান প্রদর্শনের জন্য কথা বলে, সে মূলত বিনয় থেকে দূরে সরে যায়। অথচ ইসলামে বিনয় একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান গুণ।
অন্যদিকে হাদিসে উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষের পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে। তারা হলো সুন্দর চরিত্রের অধিকারী মানুষ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসুল (সা.) এখানে সম্পদ, বংশ, পদমর্যাদা বা বক্তৃতা দক্ষতার কথা বলেননি; বরং উত্তম চরিত্রকেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুন্দর চরিত্রের মধ্যে রয়েছে সত্যবাদিতা, নম্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা এবং মানুষের প্রতি সম্মানবোধ।
বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই হাদিসের গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে। আজ মানুষ শুধু মুখে নয়, লিখনীর মাধ্যমেও নিজেদের প্রকাশ করছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে অনেকেই অযথা বিতর্ক, বিদ্রূপ, গালাগালি ও আত্মপ্রচারে ব্যস্ত। কখনো কখনো একটি মন্তব্য বা পোস্টই মানুষের চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। তাই একজন মুসলিমের উচিত কথা বলার আগে চিন্তা করা, তার কথায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন কি না এবং তা মানুষের উপকারে আসবে কি না।
কথার সৌন্দর্য কেবল সুন্দর শব্দ ব্যবহারে নয়; বরং এর পেছনের নিয়ত, ভদ্রতা ও আন্তরিকতায় নিহিত। একজন কমভাষী কিন্তু বিনয়ী মানুষ সমাজে অনেক বেশি সম্মানিত হতে পারেন, যেখানে একজন বাগ্মী কিন্তু অহংকারী ব্যক্তি মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ান।
হাদিসটির শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। মানুষের মর্যাদা তার উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতায় নয়, বরং তার চরিত্রে। যে ব্যক্তি কথায় সংযমী, আচরণে নম্র এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অনুসারী। তাই আমাদের উচিত কথার বাহুল্য ও অহংকারপূর্ণ ভাষা পরিহার করে সুন্দর চরিত্র গঠনে মনোযোগী হওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে তার কথার জৌলুস নয়, বরং তার চরিত্রের সৌন্দর্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




