হাদিসের কথা
দোয়া বদলে দিতে পারে বিপদের গতিপথ
- মানুষের অসহায়ত্ব আর দোয়ার শক্তি
- দোয়া মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়
- দোয়ার শক্তি নিয়ে নববী শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে মানুষ থাকলেও হৃদয়ের ভেতরের ব্যথা কেউ বুঝতে পারে না। তখন শক্তি, সম্পদ, সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতা তেমন কাজে আসে না। ঠিক সেই সময় মানুষ স্বভাবতই এমন এক সত্তার দিকে ফিরে যায়, যিনি সবকিছু শুনেন, দেখেন এবং অসহায়ের আর্তনাদে সাড়া দেন। সেই ফিরে যাওয়ার নামই দোয়া।
ইসলামে দোয়া শুধু চাওয়ার ভাষা নয়; এটি বান্দা ও রবের গভীর সম্পর্কের নাম। দোয়া মানুষকে তার দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা জাগায়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে তুলে ধরেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الدُّعَاءُ يَنْفَعُ مِمَّا نَزَلَ وَمِمَّا لَمْ يَنْزِلْ، فَعَلَيْكُمْ عِبَادَ اللَّهِ بِالدُّعَاءِ
অর্থাৎ, ‘দোয়া উপকার করে বিপদ নেমে আসার পরেও এবং বিপদ নেমে আসার আগেও। অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা দোয়াকে আঁকড়ে ধরো’। (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩৪০৯)
এই হাদিসের ভাষা অত্যন্ত গভীর ও আশাব্যঞ্জক। সাধারণত মানুষ বিপদে পড়লে দোয়া করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) জানাচ্ছেন, দোয়া শুধু বিপদের পরের আশ্রয় নয়; বরং বিপদ আসার আগেও এটি এক অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। কত বিপদ, কত অশান্তি, কত দুর্ঘটনা ও অকল্যাণ যে দোয়ার বরকতে মানুষের জীবন থেকে দূরে সরে যায়, মানুষ তা বুঝতেও পারে না।
তাকদিরের প্রতি ঈমান ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস। কিন্তু সেই তাকদিরের মধ্যেই আল্লাহ দোয়াকে একটি বিশেষ শক্তি হিসেবে রেখেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘দোয়া ছাড়া কিছুই তাকদির পরিবর্তন করতে পারে না’। (তিরিমিযি, হাদিস : ২১৩৯) অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা কখনো কখনো বান্দার দোয়াকেই বিপদ দূর হওয়ার মাধ্যম বানান।
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তাআলা দোয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন— ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’।(সুরা গাফির, আয়াত : ৬০)
এ আয়াতে শুধু দোয়ার অনুমতি নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান প্রতিশ্রুতি রয়েছে। মানুষ যখন দোয়া করে, তখন সে আসলে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে। আর এই বিনয়ই বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়।
বর্তমান যুগে মানুষ বাহ্যিক নিরাপত্তার জন্য কত কিছুই না করছে। উন্নত চিকিৎসা, প্রযুক্তি, বীমা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবকিছুই বাড়ছে। কিন্তু মানুষের দুশ্চিন্তা, ভয় ও অস্থিরতা কমছে না। কারণ হৃদয়ের প্রশান্তি কেবল বস্তুগত উপকরণে আসে না; আসে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হওয়ার মাধ্যমে। দোয়া সেই সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর সেতু।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় দোয়া করতেন। যুদ্ধের ময়দানে, গভীর রাতে, ভ্রমণে, অসুস্থতায়, এমনকি ছোট ছোট বিষয়েও তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলতেন। এতে শিক্ষা পাওয়া যায়, দোয়া শুধু সংকটের সময়ের ইবাদত নয়; বরং মুমিনের প্রতিদিনের সঙ্গী।
দোয়ার আরেকটি সৌন্দর্য হলো, এর মাধ্যমে মানুষ কখনো নিরাশ হয় না। পৃথিবীর দরজায় মানুষ বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। বান্দা যদি আন্তরিকভাবে ডাকতে থাকে, আল্লাহ অবশ্যই সাড়া দেন। হয়তো চাওয়া জিনিসটি সরাসরি দেন, অথবা তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন, কিংবা কোনো বিপদ দূর করে দেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. দোয়াকে ‘মুমিনের অস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অস্ত্র যেমন শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে, তেমনি দোয়া মানুষের জীবনকে অদৃশ্য বহু অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।
আজ মানুষের জীবনে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও বিপদের সংখ্যা বাড়ছে। পরিবারে অশান্তি, সমাজে ভয়, ব্যক্তিজীবনে হতাশা মানুষের হৃদয়কে ভারী করে তুলছে। এই বাস্তবতায় দোয়া শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়; বরং আত্মার প্রশান্তি ও জীবনের শক্তি।
তাই একজন মুমিনের উচিত, শুধু বিপদে পড়ে নয়; বরং প্রতিটি অবস্থায় দোয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। কারণ দোয়া এমন এক ইবাদত, যা নেমে আসা বিপদ থেকেও উপকার দেয় এবং অনাগত বিপদ থেকেও মানুষকে রক্ষা করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




